চালকদের কেন খুঁজে পায় না পুলিশ

সম্পাদকীয়

‘একটি দুর্ঘটনা, সারা জীবনের কান্না’ শীর্ষক স্লোগানটি বিভিন্ন যানবাহন ও বাস টার্মিনালে সাঁটানো থাকতে দেখা যায়। কিন্তু এই স্লোগানের মর্মার্থ সরকার, চালক, তদন্তকারী সংস্থা—কেউ উপলব্ধি করছে বলে মনে হয় না।

সড়কে দুর্ঘটনা ঘটলে প্রথম কাজ হলো এর কারণ চিহ্নিত করা। দুর্ঘটনাটি যদি চালকের কারণে হয়ে থাকে, তাঁকে খুঁজে বের করা। যদি যানবাহনের কোনো ত্রুটি থাকে, সে জন্য মালিক-চালক দুজনকেই দায় নিতে হয়। আর যদি দুর্ঘটনা সড়কের অব্যবস্থাপনার কারণে হয়ে থাকে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

প্রতিটি দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে বলা যাবে না কে বা কারা দায়ী। দায় চিহ্নিত হওয়ার পরই দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন আসে। ১০ জুন প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গেছে, এমন ক্ষেত্রে ৪২ শতাংশ চালকের হদিস পাওয়া যায় না।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো যানবাহন দুর্ঘটনায় পড়লে চালক ও তাঁর সহকর্মী পালিয়ে যান। গত আড়াই বছরে ঢাকা মহানগরের ৫০টি থানায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা হয়েছে ৪৯২টি, যার ২৭৫টির তদন্ত শেষ। মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী গাড়িচালকদের শনাক্ত করতে না পেরে ১১৬টি মামলায় পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। অবশ্য ১৫৯টি মামলায় পুলিশ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য দায়ী চালককে শনাক্ত করতে পেরেছে।

ঢাকা শহরে প্রায় সব সড়কেই ক্লোজড সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরা বসানো আছে। সড়কে টহলরত পুলিশের সংখ্যাও বেশি। তারপরও এখানে যদি ৪২ শতাংশ ঘটনায় চালকের হদিস পাওয়া না যায়, অন্যান্য এলাকার পরিস্থিতি উপলব্ধি করা কঠিন নয়। নিরাপদ সড়ক চাইয়ের (নিসচা) চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন যথার্থই বলেছেন যে নগরের রাস্তাঘাট, অলিগলিতে সিসি ক্যামেরা রয়েছে, সেখানে গাড়িচাপা দিয়ে যাঁরা মানুষ মারবেন, তাঁদের শনাক্ত করা কিংবা ধরা যাবে না, সেটি অস্বাভাবিক ঘটনা।

সারা দেশে ২২ হাজার ৪৭৬ কিলোমিটার আঞ্চলিক সড়ক ও জাতীয় মহাসড়ক এবং ২ লাখ ১৭ হাজার কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক রয়েছে। এসব সড়কে চলাচল করে ৫৬ লাখ নিবন্ধিত মোটর যান। সড়ক দুর্ঘটনায় যাঁরা মারা যান, তাঁদের বেশির ভাগ কর্মক্ষম ব্যক্তি। ফলে এই ব্যক্তিদের মৃত্যুতে পুরো পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় মামলা লড়াও কঠিন।

সড়ক পরিবহন সংস্থার (বিআরটিএ) কাছে চালকদের আঙুলের ছাপ আছে, ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র আছে, গাড়ির নম্বর ইত্যাদি আছে। এরপরও অভিযুক্ত চালককে খুঁজে না পাওয়া অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, পুলিশ আন্তরিক হলে অভিযুক্ত চালকদের খুঁজে বের করা যেত।

একজন চালক যদি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পার পেয়ে যান, তাহলে অন্যরাও বেপরোয়া হয়ে উঠবেন। সড়কে সড়কে এই বিশৃঙ্খলা ও মানুষের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। আশা করি, অভিযুক্ত চালকদের ধরতে বিআরটিএ ও পুলিশ একে অপরের ওপর দোষ না চাপিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করবে। যদি সড়কে সরকার মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে চায়, প্রতিটি দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অভিযুক্ত চালককে বিচারে সোপর্দ করতেই হবে।