নিষেধাজ্ঞা কি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধ—এ তথ্য নতুন নয়। ২০০২ সালে আইন হয়েছে, জরিমানার বিধান আছে, পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টিও বহুবার আলোচিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, দেশের ৬৩ শতাংশ মানুষ জেনেশুনেই পলিথিন ব্যবহার করছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ৫৫ শতাংশ খুচরা বিক্রেতা বলেছেন, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হলে তাঁরা পলিথিনের বিকল্প ব্যবহার করতে রাজি। পরিবেশবিষয়ক সংস্থা এসডোর সাম্প্রতিক সমীক্ষা মূলত এটাই স্পষ্ট করেছে, সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে নীতিগত অস্পষ্টতা ও বাজারভিত্তিক বিকল্পের অভাব।

নিষেধাজ্ঞার ২৩ বছর পরও পলিথিন ব্যবহার বন্ধ না হওয়ার পেছনে যেসব কারণ চিহ্নিত হয়েছে, তার প্রায় সবই শাসনব্যবস্থার দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, উৎপাদন পর্যায়ে নজরদারির বদলে খুচরা পর্যায়ে হঠাৎ হঠাৎ অভিযান, বিকল্প পণ্যের বাজার তৈরি না করা—এসবই একটি অকার্যকর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিচয়। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই; আর যেখানে প্রয়োগ আছে, সেখানে তা খণ্ডিত।

এসডোর অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হকের বক্তব্য এই ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি হিসেবেই ধরা যায়। তিনি বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার পর কয়েক বছর পলিথিন ব্যবহার কমানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ২০০৭–০৮ সালে গার্মেন্টস প্যাকেজিংয়ের নামে পলিথিনের কাঁচামাল আমদানির অনুমতির অপব্যবহার সেই অর্জন ভেঙে দেয়। অর্থাৎ একদিকে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে নীতিগত ফাঁকফোকর রেখে পলিথিন শিল্পকে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে। এর চেয়ে বড় স্ববিরোধিতা আর কী হতে পারে?

নীতিগত দুর্বলতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আইনে পলিথিনের সংজ্ঞা এতটাই ব্যাপক ও অস্পষ্ট যে উৎপাদকেরা সহজেই এর সুযোগ নিচ্ছেন। হাতলওয়ালা শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ হলেও হাতলবিহীন প্যাকেজিং ব্যাগ বৈধ—এই বিভ্রান্তি বাস্তবে পলিথিন ব্যবহারের জন্য একধরনের ‘আইনি আশ্রয়’ তৈরি করেছে। কোনটি শপিং ব্যাগ, কোনটি প্যাকেজিং—এই মৌলিক বিষয়ই যদি স্পষ্ট না হয়, তবে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে কীভাবে?

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে পলিথিন ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য ঠিক করলেও বাস্তবে প্লাস্টিক কাঁচামাল আমদানিতে প্রতিবছর শুল্ক কমছে। অর্থাৎ নীতির ভাষা একদিকে, কিন্তু অর্থনৈতিক প্রণোদনা অন্যদিকে। এই দ্বৈত নীতি পরিবেশবান্ধব আচরণকে নিরুৎসাহিত করছে এবং পলিথিন ব্যবহারের পথই মসৃণ করছে।

এসডোর চেয়ারম্যান সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদের কথায় সমাধানের মূল কথাটি স্পষ্ট, সব অংশীজনকে নিয়ে এগোতে হবে এবং সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পলিথিন বন্ধ করা যদি সত্যিই রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হয়, তবে উৎপাদন পর্যায়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প পণ্যে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, আর্থিক প্রণোদনা এবং স্পষ্ট আইন—এই চারটি একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে।

আমরা মনে করি, পলিথিন সমস্যা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার বিষয়। প্রশ্ন হলো, সরকার কি সত্যিই পরিবেশ রক্ষার পক্ষে দাঁড়াবে, নাকি নিষেধাজ্ঞা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে?