কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে

সম্পাদকীয়

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ধর্ষণ, হত্যাসহ নারী–শিশু নির্যাতন এবং নৃশংস সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার যে ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা যারপরনাই উদ্বেগজনক। গত এক সপ্তাহের মধ্যে নরসিংদীতে ধর্ষণের পর কিশোরীকে হত্যা, পাবনায় দাদি ও নাতনিকে হত্যা এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিশু হত্যার ঘটনা নাগরিকদের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ঘরে, বাইরে ও ডিজিটাল পরিসরে নারী–শিশু কোথায় নিরাপদ, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। নতুন সরকারকে অবশ্যই নারী ও শিশু নির্যাতন এবং সহিংসতা নির্মূলে কার্যকর ও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।

সাম্প্রতিক সব তথ্যপ্রমাণই বলছে, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার অভিযোগে প্রায় ২২ হাজার মামলা হয়। বাস্তবে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা যে বহুগুণ বেশি, তা বলাই বাহুল্য। অন্য যেকোনো অপরাধের তুলনায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা অনেক বেশি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছিল। গত ১৯ মাসেও পুলিশকে আগের সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা যায়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব সহিংসতা বাড়ার পাশাপাশি কোনো কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে বিশেষভাবে ক্ষমতায়িত হতে দেখা গিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তাদের অনেকেই নারীর প্রতি বিদ্বেষ ছড়ায়। জনপরিসরে নারীদের হেনস্তা ও নিগ্রহের ঘটনাও ঘটে। নারী অধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের বারবার তোলা দাবি সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার নারী ও শিশুর সহিংসতা বন্ধে জোরালো বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে নারীদের মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়।

বিচারহীনতার সংস্কৃতির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে অপরাধীদের মধ্যে এ ধারণা গেড়ে বসে যে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। এ বাস্তবতায় নারী ও শিশুরা অপরাধীদের সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে। আমরা মনে করি, সাম্প্রতিক নৃশংস হত্যাকাণ্ডগুলো তারই প্রতিফলন। ২০১৯ সালে প্রথম আলোর দুটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে ভুক্তভোগী নারী ও শিশুদের বিচারিক প্রতিকার পাওয়া কতটা দুরূহ। মামলা দিতে গিয়ে অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু হেনস্তার শিকার হন। আর প্রায় ৯৭ শতাংশ মামলায় অপরাধীদের সাজা হয় না।

বাংলাদেশের যে উন্নয়ন ও অগ্রগতি, তার পেছনে নারীদের বড় অবদান থাকলেও সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সেটাকে থমকে দিতে পারে। নতুন সরকারকে অবশ্যই নারী ও শিশুর সুরক্ষা এবং তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীন একটি টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানিয়েছে। সরকারের এই দাবিকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রুখতে সরকার যে কঠোর, সেই বার্তা শুরু থেকেই দেওয়া প্রয়োজন। ৮ মার্চ ‘বিশ্ব নারী দিবস’। প্রতিবছর দিবসটিকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজন দেখা যায়। নারী–শিশুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি যেন শুধু দিবসের বৃত্তে আটকে না যায়, সেদিকে সরকার ও নাগরিক সমাজকে সচেতন থাকতে হবে।

প্রকৃতপক্ষে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কেবল তখনই দূর হবে, যখন রাষ্ট্র ও সরকার দৃঢ়ভাবে তাদের পাশে দাঁড়াবে এবং কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করবে।