কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করুন

সম্পাদকীয়

রাজধানীতে প্রতিদিন কুকুরের কামড় বা আঁচড়ে আহত হয়ে অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, একদিকে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অন্যদিকে কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি স্থবির হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা এবং দায় এড়ানোর সংস্কৃতি।

মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২৩ সালে যেখানে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৯৪ হাজারের কিছু বেশি, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজারে। শুধু আক্রান্তের সংখ্যাই নয়, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জলাতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যাও। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাতঙ্ক এমন এক রোগ, যার লক্ষণ প্রকাশ পেলে মৃত্যু প্রায় অনিবার্য। এই প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধের উপায় হলো আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত টিকা নেওয়া এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে কুকুরের শরীরে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা নিশ্চিত করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, কোনো এলাকার ৭০ শতাংশ কুকুরকে টানা তিন বছর টিকা দিতে পারলে সেই এলাকাকে জলাতঙ্কমুক্ত করা সম্ভব। ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশে এ লক্ষ্যেই একটি সমন্বিত কর্মসূচি চালু ছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এ উদ্যোগ ব্যাহত হয়। অর্থ বরাদ্দ নেই—এ অজুহাতে বন্ধ হয়ে যায় কুকুরকে টিকা দেওয়া এবং বন্ধ্যাকরণের মাধ্যমে বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম। ফলস্বরূপ রাজপথে বাড়ছে টিকা না পাওয়া ক্ষুধার্ত ও আক্রমণাত্মক কুকুরের সংখ্যা।

সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে দায়িত্বরত সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, তারা শুধু মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে, কুকুরের জন্মহার নিয়ন্ত্রণের দায় তাদের নয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, তাদের হাতে কোনো কার্যকর কর্মসূচি নেই। সিটি করপোরেশনগুলো বলছে তাদের কাছে নেই কুকুরের সঠিক পরিসংখ্যান, নেই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। একে অপরের দিকে আঙুল তুলে এই যে দায় এড়ানোর খেলা, তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের।

জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট গাইডলাইন অনুসরণ করে নিয়মিত টিকা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সিটি করপোরেশনকে কাদা–ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে একটি সমন্বিত ‘ওয়ান হেলথ’ মডেলে কাজ করতে হবে।

আমরা মনে করি, জলাতঙ্কমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে আশা একসময় তৈরি হয়েছিল, তা কেবল কাগজ-কলমের পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অবিলম্বে বাজেটের সংস্থান করে দেশজুড়ে আবার কুকুরের টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চালু করতে হবে।