রাজশাহীতে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে 

রাজশাহীর দুর্গাপুর ও মোহনপুর উপজেলায় ফসলি জমিতে জোরপূর্বক পুকুর খননকে কেন্দ্র করে যে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতি নয়; বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিব্যবস্থার ওপর আঘাত। গত সোমবার রাতে দুর্গাপুরে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর চারটি এক্সকাভেটরে (ভেকু) অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে এক তরুণকে এক্সকাভেটরের চাকার নিচে ফেলে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে। প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে। এটি কোনোভাবে মানা যায় না।

রাজশাহীর এই অঞ্চলে তিন ফসলি জমিতে পুকুর খনন এখন এক ভয়াবহ নেশায় পরিণত হয়েছে। তথাকথিত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা জমির মালিকদের অনুমতি ছাড়াই কিংবা নামমাত্র দামে ফেলে ফসলি জমিকে পুকুরে রূপান্তর করছেন। গত ১৭ ডিসেম্বর মোহনপুরে এক তরুণকে এক্সকাভেটরের নিচে পিষে হত্যার ঘটনায় স্পষ্ট যে এই ‘পুকুর মাফিয়া’রা কতটা বেপরোয়া। একটি হত্যার পর যেখানে প্রশাসনের কঠোর হওয়ার কথা ছিল, সেখানে দুর্গাপুরের কৃষকদের অভিযোগ, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অভিযান ছিল কেবলই লোকদেখানো। প্রশাসনের উপস্থিতিতে কাজ সাময়িক বন্ধ থাকলেও তাঁদের চলে যাওয়ার পরপরই দ্বিগুণ উৎসাহে খননকাজ শুরু হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে অপরাধীরা আইনকে তোয়াক্কা করছেন না। 

দুর্গাপুরের সহকারী কমিশনারের বক্তব্যটি অত্যন্ত হতাশাজনক। ‘গভীর রাতে অভিযান চালানো যায় না’—এমন অজুহাত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অপরাধীরা যখন রাতের আঁধারকে অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, তখন অপরাধীদের রুখতে কেন কার্যকর ও কৌশলী ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? প্রশাসনের এই নিস্পৃহতা ও দায়সারা অভিযান মূলত অবৈধ খননকারীদের পরোক্ষভাবে উৎসাহ জোগাচ্ছে। অন্যদিকে মোহনপুরের হত্যাকাণ্ডে সব আসামিকে গ্রেপ্তার করতে না পারা পুলিশের সক্ষমতা ও সদিচ্ছাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

প্রভাবশালীদের ‘আর্থিক আবদার’ মেটানো কিংবা প্রশাসনের অদূরদর্শিতার বলি হচ্ছে কৃষি। ফসলি জমি রক্ষা করা কেবল কৃষকের অধিকার নয়, এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় শত শত বিঘা কৃষিজমি পুকুরে পরিণত হচ্ছে, তার জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। 

আমরা মনে করি, কেবল এক্সকাভেটর পুড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক কঠোরতা। দুর্গাপুর ও মোহনপুরের এই ঘটনায় অবিলম্বে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যেসব সরকারি কর্মকর্তা কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছেন কিংবা খননকারীদের পরোক্ষ সুবিধা দিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কৃষিজমি রক্ষার লড়াইয়ে কৃষকদের একা ছেড়ে দেওয়া মানে দেশের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে ফেলা। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, জনরোষ যখন সহিংস রূপ নেয়, তখন তার দায়ভার শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের ওপরেই বর্তায়।