পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়িতে প্রায় ১৫ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ২০০ ফুট উঁচু পাহাড় কেটে লেক তৈরির যে মহোৎসব শুরু হয়েছিল, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং এক ভয়াবহ অপরাধ। প্রশাসনের অভিযানে দুটি খননযন্ত্র জব্দ করা হলেও অপরাধীরা ধরা না পড়া আমাদের আইনি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। উন্নয়নের নাম দিয়ে বা মাছ চাষের ‘লেক’ তৈরির উসিলায় যারা প্রকৃতির বুক চিরে মাটি বিক্রি করছে, তারা মূলত এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎকেই নিলামে তুলছে।
মানিকছড়ির খাড়িছড়া এলাকার এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্যমতে, চলতি বছর ওই এলাকায় অন্তত আটটি বড় পাহাড় পুরোপুরি কেটে ফেলা হয়েছে। যখন দুর্গম এলাকায় রাতের আঁধারে এমন ধ্বংসযজ্ঞ চলে, তখন প্রশ্ন ওঠে প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে। কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় যে দুর্বৃত্তরা আশকারা পায়, তার প্রমাণ এই ১৫ একরের বিশাল পাহাড় সাবাড় করার দুঃসাহস।
পাহাড় কাটা খাসজমি বা ব্যক্তিগত মালিকানাধীন—যা–ই হোক না কেন, তা পরিবেশ আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ মনির হোসেন নামের এক ব্যক্তির দখলে থাকা এই খাসজমিতে লেক তৈরির নামে মাটি লুটের যে আয়োজন করা হয়েছিল, তা কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতসারে দীর্ঘদিন চলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বন ও পাহাড় রক্ষা না করলে এ অঞ্চলে ভূমিধস ও জীববৈচিত্র্যের যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে, তা কোনো তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না।
শুধু খননযন্ত্র জব্দ বা সাময়িক অভিযান সমাধান নয়। আমাদের দাবি, যারা এই পাহাড় ধ্বংসের মূলহোতা এবং যারা নেপথ্যে থেকে তাদের সহযোগিতা করছে, তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। পরিবেশ আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং স্থানীয় লোকজনকে সম্পৃক্ত করে একটি শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে অচিরেই চিরতরে হারিয়ে যাবে এ অঞ্চলের এমন অনেক প্রাকৃতিক অমূল্য সম্পদ।
আমরা আশা করি, শুধু মামলা দিয়েই ক্ষান্ত হওয়া যাবে না; বরং জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং পাহাড় রক্ষায় প্রশাসনকে তৎপর ও কঠোর হতে হবে। পাহাড় কাটার শ্রমিক ও অন্যান্য কর্মচারীর চেয়ে মূল হোতার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সচেষ্ট থাকতে হবে।