সুন্দরবন রক্ষায় দরকার সমন্বিত উদ্যোগ

সম্পাদকীয়

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বাসিন্দাদের পানির জন্য সংগ্রাম ও সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। বহু বছর ধরে সুন্দরবনকে রক্ষার কথা বলা হলেও বনের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার ব্যাপারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং সুন্দরবন রক্ষা এবং উপকূলীয় মানুষের জীবন–জীবিকার সংগ্রামকে সামগ্রিক চোখে না দেখে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবেই দেখে আসা হয়েছে।

প্রথম আলোর আয়োজনে গত রোববার খুলনার মোংলায় অনুষ্ঠিত ‘উপকূলে পানির সংকট ও সুন্দরবনের প্রতিবেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সুন্দরবন রক্ষায় বেশ কিছু সুপারিশ উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা, গবেষক, সরকারি কর্মকর্তা, পরিবেশকর্মী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বনজীবী, উন্নয়নকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। আলোচনায় সুন্দরবন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, বনব্যবস্থায় সংস্থাগুলোর দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলা হয়। এ ছাড়া উপকূলে সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি ব্যবহার ও দীর্ঘদিন ব্যবহারের মতো অবকাঠামো নির্মাণের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। আমরা আশা করি, সরকার এই আলোচনা ও সুপারিশ যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশ ও বন ঘিরে থাকা জনবসতির পানির সংকট সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ নেবে।

সম্প্রতি প্রথম আলোয় প্রকাশিত তিনটি প্রতিবেদনে সুন্দরবনের প্রতিবেশ সংকট ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের পানির কষ্টের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ গবেষণার বরাতে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সুন্দরবনের আশপাশে শিল্পকারখানা স্থাপনের কারণে বনের প্রতিবেশ ও বাস্তুসংস্থান কীভাবে দূষণের শিকার হচ্ছে। সুন্দরবনে প্রতি ১০টি সুন্দরীগাছের মধ্যে ৪টি (৩৯ শতাংশ) আগামরা বা টপ-ডাইং রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য উদ্বেগজনক। আমরা মনে করি, সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে এই বনকে নিজের মতো করে থাকতে দিতে হবে। সুন্দরবনকে সত্যিকার অর্থেই বিরক্ত না করার নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

৮ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘লবণাক্ত উপকূলে আর্সেনিক, জীবাণু ও সিসার ঝুঁকি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে আসে, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার মানুষের পানির সমস্যা লবণাক্ততার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের জরিপ ও সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য বলছে, পানিতে আর্সেনিক, মলজাতীয় জীবাণু ও সিসার অস্তিত্বও সেখানকার বাসিন্দাদের বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

গঙ্গা-গড়াই নদীব্যবস্থায় মিঠাপানির প্রবাহ যত কমেছে, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে লবণাক্ততা তত বেড়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক চিংড়িঘেরের কারণে অঞ্চলটিতে মিঠাপানির উৎস ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। মিঠাপানির উৎস কমে আসায় পানির সংকট সেখানকার সবচেয়ে বড় সমস্যায় রূপ নিয়েছে।

বিবিএস ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫ জরিপে দেখা গেছে, খুলনা বিভাগের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত পানির উৎসে ই কোলাই জীবাণু রয়েছে। ঘরে পান করার সময় ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের পানিতে এ জীবাণু পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের পানির উৎসে আর্সেনিকের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার বেশি। নিরাপদ ব্যবস্থাপনার খাওয়ার পানির আওতায় রয়েছেন মাত্র ১৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ।

পানির এই সংকট জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় হুমকি তৈরি করেছে। উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। নারীরা নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। একটি গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অংশের হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকির তথ্য উঠে এসেছে।

আমরা মনে করি, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের তিন জেলার বাসিন্দাদের নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করাটা সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা প্রয়োজন। সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের যৌথভাবে এবং বড় পরিসরে পুকুরের পানি পরিশোধন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।