সন্দ্বীপে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়েছিলেন দ্রুত চট্টগ্রামে নিয়ে যেতে। কিন্তু ঘাটে কোনো নৌযান নেই; স্বজনেরা দৌড়াদৌড়ি করে একটি স্পিডবোটের ব্যবস্থা করলেও লাভ হয়নি। বোটে ওঠার আগেই তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। সন্দ্বীপে এটা কোনো ব্যতিক্রম নয়।
মুমূর্ষু রোগীর যাতায়াতের জন্য যে নৌ অ্যাম্বুলেন্সের প্রয়োজন ছিল, সেটা এক কেওড়াবাগানের গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। কারণ, এটা সমুদ্রপথে চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত। শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও সন্দ্বীপ নিয়ে প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ চিত্র ফুটে উঠেছে। কেবল যথাযথ ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে অকালমৃত্যু বাংলাদেশের নাগরিক অধিকারের এক মর্মান্তিক চিত্র প্রকাশ করেছে।
অকালমৃত্যুর মর্মান্তিকতার পাশাপাশি এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, অবহেলা ও উদাসীনতার রূপটিও উন্মোচিত করেছে। এই অব্যবস্থাপনার বলি হয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। সমুদ্রঘেরা সন্দ্বীপের অসুস্থ ও মুমূর্ষু রোগীদের জন্য যেখানে নৌ অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা, সেখানে স্থানীয় মানুষকে স্পিডবোট, মালবাহী ট্রলার বা ঝুঁকিপূর্ণ ছোট নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হয়।
প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, দ্বীপের মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত মূল ভূখণ্ডে পৌঁছানোর জন্য সরকারের দেওয়া ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ের দুটি নৌ অ্যাম্বুলেন্সের একটিও আজ কাজে আসছে না। ২০০৮ সালে দেওয়া প্রথম নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি চালক ও জ্বালানির অভাবে ১৫ বছর ধরে অচল পড়ে রয়েছে। আর ২০১৫ সালে ৬৫ লাখ টাকায় কেনা দ্বিতীয় নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি এক দিনের জন্যও রোগী পরিবহনে ব্যবহৃত হয়নি। কারণ, সমুদ্রঘেরা দ্বীপের জন্য যে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়েছে, সেটা মূলত হাওর বা নদীর মতো জলপথের জন্য উপযোগী; সমুদ্রপথে চলাচলের সক্ষমতাই নেই।
প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে? সরকারি অর্থ ব্যয় করে নৌযান কেনা হলো, অথচ চালক ও জ্বালানির মতো মৌলিক জোগান নিশ্চিত করার কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রাখা হলো না। তারপরও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা না করে সমুদ্রের জন্য দেওয়া হলো হাওরের নৌযান।
নাগরিকের জীবন–মৃত্যুর প্রশ্ন যেখানে জড়িত, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও উদাসীনতা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। আর কত প্রাণ অকালে ঝরলে কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙবে? স্রেফ চালক ও জ্বালানির অভাবে মুমূর্ষু রোগীরা একটা নৌ অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে না পেরে মারা যাচ্ছেন, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমরা আশা করি, কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সন্দ্বীপবাসীর জন্য নৌ অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করবে।