দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে

সম্পাদকীয়

পুলিশের শীর্ষ পদে থেকে বেনজীর আহমেদ দুর্নীতি ও অপরাধের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, সেটি প্রকৃতপক্ষেই ‘বে–নজির’। একসময়ের ক্ষমতাধর এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ছয়টি মামলার তদন্ত ও বিচার চলছে। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা, ভয় দেখিয়ে সংখ্যালঘুদের জমি কেনা এবং ভুয়া পিএইচডি ও পাসপোর্ট কেলেঙ্কারির মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনার ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে ওঠা এসব অভিযোগ ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহারের ধ্রুপদি উদাহরণ।

শুধু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই নয়; ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল পদে থেকে কেউ যাতে এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করার জন্যই বেনজীরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া জরুরি। এ প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার হওয়ার খবরটি স্বস্তির এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এক ধাপ অগ্রগতি। তবে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও বিচারের মুখোমুখি করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, দুর্নীতির মামলায় ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশ বেনজীরকে গ্রেপ্তার করে ১২ জুন ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানায়। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতি ও বিপুল সম্পত্তি অর্জন নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান শুরু করলে ওই বছরের ৪ মে সপরিবার দেশ ছাড়েন তিনি। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের মামলায় তাঁর বিচার শুরু হলে ২০২৫ সালের মে মাসে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হয়।

বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর অর্থ শুধু একজন পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা নয়; বরং ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন সাবেক পুলিশপ্রধানকে তাঁর কৃতকর্মের জন্য আইনের মুখোমুখি করার নজির। বেনজীরকে গ্রেপ্তার করার মধ্য দিয়ে ইন্টারপোল তার দায়িত্ব পালন করেছে, এখন তাঁকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকারের। 

গত রোববার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত করবে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটি সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় কূটনৈতিক যোগাযোগ এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে। সে ক্ষেত্রে সরকারকে মামলার পুরো প্রেক্ষাপট, আদালতের আদেশ, বেনজীর আহমেদ কেন বাংলাদেশে ‘ওয়ান্টেড’—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব পাঠাতে হবে। আমরা মনে করি, পুরো প্রক্রিয়া কতটা কার্যকরভাবে করা হবে, তার ওপরই বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি নির্ভর করছে।

প্রভাবশালী অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারলেই বিচার এড়াতে পারেন, এ রকম একটি ধারণা আমাদের দেশে পাকাপোক্তভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। এই ধারণা ভাঙার একটি বড় সুযোগ সরকারের সামনে এসেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর বিকল্প নেই।