কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের কাজকে সহজতর করার পাশাপাশি নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। তবে প্রযুক্তির ইতিহাস বলে, প্রতিটি উদ্ভাবনের সঙ্গে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকিও তৈরি হয়। সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ্বের জনপ্রিয় কয়েকটি এআই প্ল্যাটফর্ম সূক্ষ্ম নির্দেশনার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি, নাম, পরিচয়পত্রের নম্বর এমনকি স্বাক্ষর পর্যন্ত পরিবর্তন করে দিতে সক্ষম। এই তথ্য শুধু প্রযুক্তিগত দুর্বলতার প্রশ্নই তোলে না, এটি নাগরিক নিরাপত্তা, আর্থিক খাত এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের উদ্যোগ ডিসমিসল্যাবের পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিভিন্ন এআই প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। কোথাও কঠোর সীমাবদ্ধতা থাকলেও কোথাও আবার কার্যত কোনো দৃশ্যমান বাধা নেই। বিশেষ করে গুগলের জেমিনি এবং এক্সএআইয়ের গ্রোক তুলনামূলক বাস্তবসম্মত পরিচয়পত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে নাম, পিতা-মাতার পরিচয়, পরিচয় নম্বর এবং স্বাক্ষর পর্যন্ত পরিবর্তন করা গেছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। কারণ, এসব পরিবর্তন সরাসরি পরিচয় জালিয়াতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সাধারণত দাবি করে যে তাদের এআই সিস্টেমে শক্তিশালী নিরাপত্তা সুরক্ষা বা ‘গার্ডরেল’ রয়েছে। প্রকাশ্য নীতিমালায়ও জালিয়াতি, প্রতারণা এবং ভুয়া পরিচয় তৈরির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তব পরীক্ষা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। এর অর্থ হলো নীতিমালা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এখনো বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে। এআই মডেলগুলো অনেক সময় সরাসরি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেও পরোক্ষ বা কৌশলী নির্দেশনার মাধ্যমে একই ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে নিরাপত্তাব্যবস্থা কাগজে-কলমে যতই কঠোর হোক, বাস্তবে তা সব সময় কার্যকর নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও গভীর। দেশে ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল সিম নিবন্ধন, চাকরির আবেদন, পাসপোর্ট, ভিসা কিংবা বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র একটি মৌলিক নথি। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কেবল নথির দৃশ্যমান তথ্যের ওপর নির্ভর করে। যদি এআই ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্য ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করা সম্ভব হয়, তাহলে আর্থিক প্রতারণা, সাইবার অপরাধ, জালিয়াতি এবং পরিচয় চুরির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো, এই সমস্যা কোনো একক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ডিসমিসল্যাবের পরীক্ষায় মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিচয়পত্রেও একই ধরনের দুর্বলতা ধরা পড়েছে। অর্থাৎ এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। এমনকি যেসব কোম্পানি নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে উন্নত বলে দাবি করছে, তাদের মধ্যেও প্রতিরোধের সক্ষমতায় বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এআই প্রযুক্তির বিকাশ কি নিরাপত্তা ও নৈতিকতার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে?