বাংলাদেশে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন 

সম্পাদকীয়

বরেণ্য সাংবাদিক মার্ক টালির মৃত্যু আমাদের জন্য শুধু একজন মানুষের প্রস্থান নয়; তাঁর মৃত্যু এই দেশের জন্মযুদ্ধের এক সাক্ষীর বিদায়। অন্ধকারতম সময়েও সত্যের আলো হাতে তিনি ইতিহাসের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

মার্ক টালি ছিলেন সেই বিরল সাংবাদিকদের একজন, যাঁদের কণ্ঠস্বর একটি জাতির জন্মস্মৃতির অংশ হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কঠোর সেন্সরশিপ, সংবাদপত্রের নিয়ন্ত্রণ এবং ভয়ভীতির আবহে যখন দেশে চলমান গণহত্যা ও মানুষের দুর্ভোগ আড়াল করা হচ্ছিল, তখন বিবিসির তরঙ্গে তাঁর কণ্ঠ ভেসে আসত নির্ভরযোগ্য খবর ও সংযত বিশ্লেষণ নিয়ে। সেই সময় বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের কাছে মার্ক টালি প্রায় সংবাদের সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন। তখন রেডিওর পাশে বসে মানুষ শুধু সংবাদ শোনেননি; তাঁরা ভরসা পেয়েছেন, অনুভব করেছেন যে তাঁদের অভিজ্ঞতা বিশ্ব শুনছে।

মার্ক টালির সাংবাদিকতার মূল শক্তি ছিল তাঁর পদ্ধতিগত সততা। তিনি নাটকীয়তা বা অতিরঞ্জনের আশ্রয় নেননি। গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার দৃশ্য, শরণার্থীদের স্রোত, দমন–পীড়নের কাঠামো তিনি তুলে ধরেছেন তথ্যের শৃঙ্খলা ও ভাষার সংযম বজায় রেখে। এই সংযমই তাঁর প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্মাণ করেছে। একাত্তরে ঢাকায় তাঁর সংক্ষিপ্ত সফর আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সীমিত সময় ও নজরদারির মধ্যেও তিনি যা দেখেছিলেন, তা সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। পরে লন্ডনে বসে কলকাতা ও দেশের ভেতরের সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করে বিশ্বজনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি জানতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু বন্দুক নয়; তথ্যও অস্ত্র এবং সেই অস্ত্রটি তিনি ব্যবহার করেছেন নৈতিক দায়িত্ববোধ দিয়ে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর কাজ কেবল ঘটনা বর্ণনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক পশ্চিমা গণমাধ্যম যখন একে শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে দেখছিল, তখন টালি মুক্তিযুদ্ধকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, মানবাধিকার ও স্বাধিকারের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। স্বাধীনতার পর তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছিল, যা ছিল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নৈতিক সাহসের প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও সমাজ নিয়েও টালির রয়েছে বিস্তৃত কাজ। ক্ষমতার ভাষার বাইরে মানুষের গল্প অনুসন্ধান ছিল তাঁর সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্য। হেনস্তা, হুমকি কিংবা আটক করে তাঁকে থামানো যায়নি। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা তাঁর কাছে ছিল পেশার নৈতিক ভিত্তি।

আজ যখন তথ্যের ভিড়ে সত্য হারিয়ে যায়, তখন মার্ক টালির দেখানো পথ অনুসরণ করা জরুরি। টালি দেখিয়েছেন, নিরপেক্ষতা মানে নির্লিপ্ততা নয়—বরং দমনের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে সত্য বলা। জীবনাবসান হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এই বন্ধুর কণ্ঠস্বর অমর রবে আমাদের ইতিহাসে ও জাতীয় চেতনায়। তাঁর স্মৃতির প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই।