সব পক্ষকে ধৈর্য ধরতে হবে

সম্পাদকীয়

দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য অপরিহার্য যে আইনের শাসন ও রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা, তার ঘাটতি আমরা দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ করে এসেছি। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর হঠাৎ করেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার ঘটনা শুধু অস্বাভাবিক নয়, উদ্বেগজনকও।

শুক্রবার গণ অধিকার পরিষদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলায় দলের সভাপতি নুরুল হকসহ কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। আমরা এ হামলার নিন্দা জানাই এবং আহত ব্যক্তিদের সুচিকিৎসার দাবি করছি। নুরুল হককে লাঠিপেটা করার ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারও নিন্দা জানিয়েছে।

রোডম্যাপ ঘোষণার পর যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনমুখী হওয়ার কথা, সেখানে কেন এ ধরনের সংঘাত? ঘটনা সম্পর্কে জাতীয় পার্টি ও গণ অধিকার পরিষদ একে অপরকে দোষারোপ করেছে এবং সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ এনেছে।

অন্যদিকে জাতীয় পার্টি ও গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার বলেছেন, দুই পক্ষের সংঘর্ষ থামাতেই সেনাবাহিনী ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সরকারের উচিত পুরো বিষয়টি তদন্ত করে  প্রকৃত সত্য জনগণের কাছে তুলে ধরা এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। অপরাধীকে যেমন ছাড় দেওয়া যাবে না, তেমনি নিরপরাধ কেউ অযথা হয়রানির শিকার হবেন, তা–ও কাম্য নয়।

এর আগের দিন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে মঞ্চ ৭১–এর একটি গোলটেবিল বৈঠককে কেন্দ্র করে যে মব সহিংসতা হলো, সেটাও অত্যন্ত নিন্দনীয়। সংগঠনটি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেছিল। কিন্তু কর্মসূচি চলাকালে কয়েকজন যুবক সেখানে গিয়ে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যায়িত করে আয়োজক ও অতিথিদের হেনস্তা ও মারধর করেন। এখানে সরকারের ভূমিকাও আইনের শাসনের পরিপন্থী। তারা মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আক্রান্তদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে।

কেবল এ দুটি ঘটনা নয়, বৃহস্পতিবার দিনাজপুরের বিরল উপজেলায় জীবন মহল নামের একটি বিনোদন পার্কে একদল লোক ‘তৌহিদী জনতার’ ব্যানারে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছেন। সেখানে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড হয়ে থাকলে তাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে পারতেন। কিন্তু সেটা না করে সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছেন।

একের পর এক আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ও মব সন্ত্রাসের ঘটনা কেবল সমাজে ভুল বার্তা দেয় না, জননিরাপত্তাও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। সরকার মুখে মব সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন কমই ঘটছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অঘটন ঘটার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর হতে দেখা যায়।

আমরা মনে করি, বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলাজনিত নয়। এর পেছনে রাজনীতির হিসাব–নিকাশও আছে। রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক—যেকোনো ধরনের সহিংসতা হোক না কেন, সরকারকে তা শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে।

রোডম্যাপ ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম অনেক বেশি দৃশ্যমান। সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে মতবিনিময় ও নিবন্ধনের কাজ শেষ করবে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের একার কাজ নয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহনশীল ও সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

যেকোনো বিষয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। যেকোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে হবে আলোচনার মাধ্যমে, আইনি পথে। এখানে সহিংসতা বা জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই। কোনো রাজনৈতিক দল বা পক্ষের এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত হবে না, যাতে নির্বাচনপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত কিংবা বিলম্ব হয়।