বাগেরহাটের রামপালে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। নববধূর হাতের মেহেদির রং শুকানোর আগেই বর-কনেসহ একই পরিবারের ৯ জন এবং সব মিলিয়ে ১৪ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং একেকটি স্বপ্নের করুণ মৃত্যু। কনের বাড়ি থেকে হাসি-আনন্দে বরের বাড়ি ফেরার পথে এই মুখোমুখি সংঘর্ষ একটি সাজানো–গোছানো পরিবারকে একনিমেষেই ধ্বংস করে দিল।
খবর অনুযায়ী, বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষে এ বিপর্যয় ঘটে। নয়টি মসজিদে খবর পাঠিয়ে খাটিয়া আনিয়ে একই পরিবারের নয়জনকে পাশাপাশি শুইয়ে রাখার যে দৃশ্য মোংলাবাসী প্রত্যক্ষ করেছে, তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। প্রশ্ন জাগে, দেশে আর কতবার নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হলে আমাদের সড়কগুলো নিরাপদ হবে? একটি আনন্দযাত্রা কেন এভাবে গণজানাজায় রূপ নেবে?
সড়ক দুর্ঘটনার পর তদন্ত হয়, মামলা হয়, কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর মূল কাজটি যেন সব সময়ই অধরা থেকে যায়। বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের বেপরোয়া গতি, দক্ষ চালকের অভাব কিংবা সড়কের কারিগরি ত্রুটি—যে কারণেই হোক না কেন, প্রতিটি মৃত্যুর দায় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতেই হবে। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় যখন পরিবারের কর্মক্ষম সদস্য থেকে শুরু করে কোলের শিশু পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তখন সেই পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
আমরা প্রায়ই দেখি, দুর্ঘটনার পরপরই পাল্টাপাল্টি দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়। কিন্তু সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল থামানোর জন্য প্রয়োজন টেকসই ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান। ভারী যানবাহনের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ এবং ছোট যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের ‘হত্যাযজ্ঞ’ বারবার ঘটতেই থাকবে। ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে—এটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঠিক থাকলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ী পক্ষকে বিচারের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
রামপালের এই ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে আমাদের সড়কগুলো এখনো যমদূত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এই শোকাবহ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। সেই সঙ্গে নিহত ব্যক্তিদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। আমরা আশা করব, স্থানীয় প্রশাসন ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে থাকবে।