যেকোনো নগর-পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। কোন এলাকার বর্জ্য কোথায় সংগ্রহ করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে তা কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে—এগুলোর ওপরই নির্ভর করে এ এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য ও জনস্বাস্থ্য। কিন্তু রাজশাহী ও নাটোর জেলার ২৩টি পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সম্প্রতি প্রথম আলোতে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তাতে এই ব্যবস্থাপনার এক আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই বলছে ‘পৌরসভা হওয়ার আগেই ভাগাড়টা ঠিক করা দরকার’, সেখানে দীর্ঘদিন যাবৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতি দুঃখজনক।
সংবাদসূত্রে জানা যায়, এই ২৩টি পৌরসভার মধ্যে ২২টিরই বর্জ্য ফেলা হচ্ছে যেখানে-সেখানে। রাস্তার পাশে, ফসলি জমিতে, এমনকি প্রবহমান নদেও। মাত্র একটি পৌরসভা সিটি করপোরেশনের ডাম্পিং স্টেশন ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে, কিন্তু বাকি কোনো পৌরসভারই নিজস্ব কোনো ভাগাড় বা বর্জ্য পরিশোধনাগার নেই। স্থানীয় সরকার বিভাগের নাটোরের উপপরিচালকের কথায়ই এই পরিস্থিতির জুতসই উপমা পাওয়া যায়, ‘যত ভালো বাড়িই হোক, তাতে যদি বাথরুম না থাকে, তাকে ভালো বাড়ি বলা যায় না।’ আমাদের পৌরসভাগুলোর অবস্থা বর্তমানে ঠিক তেমনই দাঁড়িয়েছে।
এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। যেখানে-সেখানে ময়লা-বর্জ্য ফেলার কারণে ছড়িয়ে পড়া দুর্গন্ধ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে। নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণে সেটিও এখন মৃতপ্রায়। এই দুর্গন্ধ স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। এক এলাকাবাসী আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাতাস যেদিকে যায়, দুর্গন্ধও সেদিকে যায়; তখন আর টিকে থাকা যায় না।’ প্রতিবেদনে এমনকি কয়েকটি স্থানে গাছ মরে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
পৌরসভার যে নাগরিক সেবা প্রদান করার কথা, তার প্রাথমিক ও অন্যতম হচ্ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। কিন্তু প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জমি না পাওয়ার অজুহাত বা ধাপে ধাপে কাজ হওয়ার আশ্বাস নাগরিক দুর্ভোগের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ দেখাতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কেবল প্রশাসনিক চিঠি কিংবা আশ্বাসের কথা শুনিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এমন পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ও প্রশাসনিক অবহেলা সামগ্রিকভাবে এলাকার পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে নাজুক করে তুলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যত দ্রুত সম্ভব বর্জ্য অপসারণের সুষ্ঠু ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা আশা করব, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন এই সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে রাজশাহী ও নাটোরের পৌরসভাগুলোর বর্জ্য ভাগাড়ের জন্য জমি জোগাড়ের উদ্যোগ নেবে। গণমাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নানা সংকটের চিত্র নিয়মিতই উঠে আসছে। আমাদের আধুনিক নগর-পরিকল্পনার অন্যতম কেন্দ্রীয় জায়গায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে রাখতেই হবে।