শ্যামনগরে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা জরুরি

সম্পাদকীয়

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের উপকূলীয় জনপদে সুপেয় পানির সংকট আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা এখন আর পরিবেশগত বিপর্যয়ের মধ্যে নেই, চরম মানবিক সংকট তৈরি করেছে। চারদিকে অথই জলরাশি থাকলেও পানের যোগ্য এক ফোঁটা পানি নেই—প্রকৃতির এই নির্মম পরিহাস উপকূলের মানুষের ললাটলিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরও দুঃখজনক হচ্ছে, উপকূলের এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সরকার কখনোই সে অর্থে আন্তরিকতা বা সদিচ্ছার পরিচয় দেয়নি।

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা চিত্র বলছে, এক কলসি সুপেয় পানির জন্য সেখানে নারী-শিশুদের মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, এমনকি নদী সাঁতরেও পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এ দৃশ্য একটি আধুনিক রাষ্ট্রে জনস্বাস্থ্যের অধিকারের চরম লঙ্ঘন। উপকূলের এই জীবনসংগ্রামের গভীরতা কেবল দূরত্বের মাপে বোঝা সম্ভব নয়। এর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব আরও ভয়াবহ। পানির কষ্টের কারণে ওই অঞ্চলে বিয়ে ভেঙে যাওয়া কিংবা নতুন করে কেউ আত্মীয়তা করতে না চাওয়ার এই করুণ বাস্তবতা রাজধানীর সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ও নীতিনির্ধারকদের কোনোভাবেই স্পর্শ করবে না। পানির সংকটে যখন একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয় কিংবা একজন ষাটোর্ধ্ব নারীকে ভেজা কাপড়ে নদী পার হয়ে আসতে হয়, তখন বুঝতে হবে সংকটটি কেবল ‘অসুবিধা’র পর্যায়ে নেই; এটি একটি মানবিক বিপর্যয়।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এপ্রিল থেকে জুলাই—এই চার মাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৩০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাওয়া এবং লোনাপানির আগ্রাসনে অধিকাংশ নলকূপ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অথচ এই সংকট আকস্মিক নয়; জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিবছরই পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর একই সময়ে সংকট ঘনীভূত হবে জেনেও কেন স্থায়ী কোনো সমাধান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? সরকারি পর্যায়ে পুকুর খনন বা বিকল্প উৎসের প্রকল্পের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।

সেখানে মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেখালিতে একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে পুকুরের পানি পরিশোধন করে সীমিত আকারে সরবরাহের যে প্রচেষ্টা চলছে, তা সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট এলাকার সামান্য উদ্যোগ দিয়ে এই বিশাল জনপদের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। এখানে প্রয়োজন টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি পরিকল্পনা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং) আধুনিক প্রযুক্তি প্রতিটি পরিবার বা পাড়াভিত্তিক পৌঁছে দেওয়া এবং বৃহৎ আকারে লবণাক্ততা দূরীকরণ (ডি-স্যালাইনেশন) প্ল্যান্ট স্থাপন এখন সময়ের দাবি।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, উপকূলের মানুষের কাছে এখন উন্নয়ন মানে যেন এক কলসি সুপেয় পানির নিশ্চয়তা হয়ে উঠেছে। ওই অঞ্চলের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার নিশ্চিত করতেও এটি জরুরি।