রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত যাচাই হতে হবে

সম্পাদকীয়

চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডসহ সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় করা মামলাগুলো যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা সময় এসব মামলা আলোচনা ও সমালোচনার অন্যতম বিষয় ছিল। অনেক মামলায় ঢালাওভাবে আসামি করাসহ নানা অসংগতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রথম আলোসহ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে। জামিন পাওয়ার শর্ত থাকার পরও হত্যা মামলায় অনেককে আটক রাখার অভিযোগ ওঠে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে ৫ আগস্টের পরের মামলাগুলোর এজাহার পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্তটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তবে যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে হওয়াটা জরুরি। প্রক্রিয়াটি যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট না হয়, সেদিকে শুরু থেকেই সরকারের সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৈঠক করেন। এরপর তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ব্যবসায়ী, স্বনামধন্য ব্যক্তিসহ মানুষ যাতে ভোগান্তির শিকার না হন, সে জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মামলাগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পুলিশকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে অভ্যুত্থানের আগে-পরে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হন। আহত হন প্রায় ১৮ হাজার। এসব হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধের ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সরকারের। বিএনপির ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতিও এটি। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারেরও প্রধান তিনটি অঙ্গীকারের একটি ছিল বিচার নিশ্চিত করা। তবে অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনার সঙ্গে মোটেই সংশ্লিষ্ট নন এমন ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলার আসামি করা হয়। গত বছরের ২৭ এপ্রিল ‘ঢালাও মামলার আসামির নেপথ্যে বাণিজ্য, বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উঠে আসে, কীভাবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মামলার প্রকৃত আসামি, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, অন্যত্র থাকা ব্যক্তি ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের হয়রানিমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এসব মামলা যাচাই-বাছাইয়ের কথা বললেও শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি।

আমরা মনে করি, ৫ আগস্টের পরের মামলাগুলো যথাযথভাবে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সময় নির্ধারণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়াটাও জরুরি। অন্যথায় এটি স্থানীয় পর্যায়ের পুলিশ প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিষয় হয়ে উঠবে। এতে প্রক্রিয়াটিতে দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি রাজনীতিকরণের ঝুঁকি তৈরি হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছিল পুলিশ ও বিচার বিভাগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা। সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান যথার্থই বলেছেন, একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করে, এমন প্রমাণের ভিত্তিতেই কাউকে মামলায় অভিযুক্ত করা উচিত। এ ক্ষেত্রে ছবি, ভিডিও, অডিও, মুঠোফোনের কল রেকর্ডসহ নির্ভরযোগ্য ও যাচাইযোগ্য তথ্যপ্রমাণ থাকতে হবে।

জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত পরিবারগুলোর ও আহত ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়াটা একটি অধিকার। সেটা নিশ্চিত করাটা সরকারের জন্য প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। ফলে অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি পেতেই হবে, কিন্তু নির্দোষ ব্যক্তিরা কোনোভাবেই যেন ভুক্তভোগী না হন, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা মনে করি, ৫ আগেস্টর পরের মামলাগুলো যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত হওয়াটা বাঞ্ছনীয়।