চালক ও আরোহীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন

সম্পাদকীয়

একটি আঘাত বা একটি ধাক্কা অনেক সময় একজন মোটরসাইকেল আরোহীর জীবন-মৃত্যুর সীমারেখা হয়ে ওঠে। অথচ এই সীমারেখাকে সুরক্ষা দেওয়া হেলমেটই এমন প্রতারণার মুখোশে পরিণত হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তার আশ্বাসের আড়ালে অনিরাপত্তার নির্মম আয়োজন লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

প্রথমত, হেলমেটের নামমাত্র ব্যবহার অথবা তার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি আমাদের সামষ্টিক গাফিলতির ফাঁক উন্মোচন করে। শহরের ব্যস্ত সড়কে বাইকচালকের মাথায় যেনতেনভাবে হেলমেটের উপস্থিতি দেখা গেলেও জেলা ও উপজেলায় এর অদৃশ্যতা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সেখানে হেলমেট আর নিরাপত্তার প্রতীক নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় এক বোঝা হিসেবে দেখা হয়।

দ্বিতীয়ত, বড় গলদ আছে আমদানি প্রক্রিয়ায়। মাত্র আড়াই শ টাকায় একটি হেলমেট আমদানি দেখিয়ে সেটি বাজারে সাত হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এটি কাঠামোগত প্রতারণা। আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাচারের পথ তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয়ত, মান নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে বাজার যেন অভিভাবকহীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে পণ্যটির সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে মানুষের প্রাণ, সেটিই বাজারে মানচিহ্নহীন, পরীক্ষাহীন, দায়িত্বহীনভাবে বিক্রি হচ্ছে। ১৫০ বা ৫০০ টাকার প্লাস্টিকের খোলস হেলমেটের ছদ্মবেশে মানুষের মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আরও নির্মম হলো, এই নিম্নমানের পণ্যই কখনো কখনো উচ্চ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। ভোক্তা যেন নিরাপত্তা কিনছেন না, কিনছেন বিভ্রম—যেখানে সুরক্ষার অনুভূতি আছে, কিন্তু সুরক্ষা নেই। এর অনিবার্য পরিণতি হলো সড়কে মৃত্যু। অর্থাৎ একটি হেলমেট শুধু মাথা রক্ষার ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির রক্তক্ষরণেও ভূমিকা রাখছে। প্রাণ ও সম্পদবিষয়ক এই দ্বৈত ক্ষতি আমাদের সামনে নৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্র কি তার নাগরিকের জীবন রক্ষার মৌলিক উপকরণটি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হতে পারে? একটি বাজার কি অবাধে এমন প্রতারণা চালাতে পারে, যেখানে জীবন রক্ষার পণ্যই হয়ে ওঠে মুনাফার সবচেয়ে নির্মম হাতিয়ার?

সমাধান অবশ্যই আছে, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা। হেলমেট আমদানিতে প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, শুল্ক ফাঁকি ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, বিএসটিআইয়ের মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং সর্বোপরি হেলমেট ব্যবহারের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা—এসব পদক্ষেপ গ্রহণে আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। কারণ, প্রতিটি অবহেলা, প্রতিটি অনিয়ম, প্রতিটি ভেজাল—শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে একটি মানুষের মাথায়, একটি পরিবারের ভবিষ্যতে।