মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন ক্ষুণ্ন না হয়

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে একটি প্রত্যাশা জড়িয়ে থাকে—অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অধিকতর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। সে ক্ষেত্রে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পূর্ববর্তী সরকারগুলোর দমনমূলক উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে আসা। সেটা নিশ্চিত করতে হলে নীতির পরিবর্তন করা জরুরি। ২৩ এপ্রিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা নতুন সরকারের সামনে সেই পুরোনো প্রশ্নই আবার তুলে ধরেছে—ক্ষমতার পরিবর্তন কি নীতির পরিবর্তন ঘটাতে পারছে?

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত শুক্রবার পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদকে নিয়ে ‘আপত্তিকর’ পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে এক কলেজছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া গত এক মাসে অন্তত চারজনকে ৫৪ ধারা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং সাইবার সুরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার এবং একজনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সাইবার নিরাপত্তা এবং অন্যান্য নিবর্তনমূলক আইনে মামলা ও গ্রেপ্তারের এই ঘটনাগুলো জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনি কাঠামো ব্যবহার করে সাংবাদিক, অ্যাকটিভিস্ট ও সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছিল। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই সরকারের পতনের পর যে অন্তর্বর্তী সরকার এসেছিল, তারা কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি। এ প্রেক্ষাপটে নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে নাগরিকদের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

সমস্যার মূল নিহিত রয়েছে আইনি কাঠামোর ভেতরেই। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনলেও এর ভেতরে এখনো অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। একইভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা কিংবা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো আইনগুলো অতীতে যেভাবে অপব্যবহৃত হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তিও বন্ধ হয়নি। আইনেই যখন অস্পষ্টতা থাকে, তখন তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়—এটি একটি অতিপরিচিত বাস্তবতা।

এইচআরডব্লিউর এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের দাবিতে আন্দোলন করেছে। সে প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের দায়িত্ব আরও বেশি। তার মতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যারও ইঙ্গিত দেয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, পুলিশ-প্রশাসন প্রায়ই রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকতে পারেনি। নতুন সরকারের অধীনও যদি একই প্রবণতা বজায় থাকে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর হবে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তি (আইসিসিপিআর) স্পষ্টভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। এই স্বাধীনতার মধ্যে সরকারের সমালোচনা করার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটিও বলেছে, এই অধিকার অনলাইনেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আমরা আশা করব, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন সরকার একটি উদার, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুত রক্ষা করবে। এর জন্য প্রয়োজন আইনের সংস্কার, অস্পষ্ট ও অপব্যবহারযোগ্য ধারাগুলো বাতিল করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা। সরকারকে জনগণের সমানে এই ধারণা তুলে ধরতে হবে যে সমালোচনাকে তারা গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে ভিন্নমতকে দমনের পুরোনো নীতি নয়, বরং তা গ্রহণ ও আলোচনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়াই একটি পরিণত রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য।