নৌ পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই

সম্পাদকীয়

নদীপথে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজির মতো অপরাধ যে কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, তা নদীপথে অপরাধ নিয়ে প্রথম আলোর দুই পর্বের প্রতিবেদনে সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অপরাধীরা হত্যা, ধর্ষণের মতো অপরাধের আলামত মুছে ফেলার কৌশল হিসেবে নদীপথকে বেছে নিচ্ছে। সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠী, বিশেষ করে নৌ ডাকাত আর জলদস্যুরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে তারা পুলিশের ওপর আক্রমণ করতেও পিছপা হচ্ছে না। এ বাস্তবতায় নদীপথে নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি যে বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে, সেটা বলাই বাহুল্য।

নৌ পুলিশের বরাতে প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫ বছর ৯ মাসে দেশের বিভিন্ন নদ–নদী থেকে ২ হাজার ৪৯৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি যেমন আছেন, তেমনি বিভিন্নভাবে নদীতে পড়ে দুর্ঘটনাবশত মৃত্যু এবং নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার ঘটনাও রয়েছে। এ সময়ে ১ হাজার ৭৩৯ জনের মরদেহ শনাক্ত হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত হয়নি ৭৫৫ জনের।

অপরাধবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বাস্তব অপরাধের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে ও গ্রেপ্তার এড়াতে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয় অপরাধীরা। কেননা, অনেক ক্ষেত্রেই আঙুলের ছাপ মুছে যাওয়ায় ও চেহারা বিকৃত হওয়ার কারণে পরিচয় শনাক্ত করা যায় না। লাশ গুমের জন্য নদীকে ‘নিরাপদ স্থান’ হিসেবে ব্যবহারের নজির রয়েছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে, যত দিন যাচ্ছে, নদীপথে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ততই বাড়ছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় নদীপথ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির বাইরে রয়েছে।

শুধু মরদেহ উদ্ধার নয়; দেশের নদীপথে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ছিনতাই, মাদক পাচার ও অবৈধ বালু উত্তোলনের মতো অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মাছ ধরতে গিয়ে জলদস্যুদের গুলিতে জেলে নিহত হচ্ছেন, চাঁদা না দেওয়ায় নৌশ্রমিকদের ওপর হামলা হচ্ছে, পণ্যবাহী নৌযান থেকে মালামাল লুট হচ্ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়ে নৌ পুলিশের সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। পরিস্থিতি যে কতটা উদ্বেগজনক, নৌ পুলিশের মামলার পরিসংখ্যানেই তার প্রতিফলন রয়েছে।

নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নদীপথকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধে ২ হাজার ৮৫টি মামলা হয়েছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৯টি। অর্থাৎ এক বছরেই মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৩১৪টি। তবে নথিভুক্ত মামলাই অপরাধের পুরো চিত্র নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে অপরাধের ঘটনা আরও বেশি।

দেশে বর্ষা মৌসুমে নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার এবং শুষ্ক মৌসুমে সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার। বিশাল এই নৌপথে নৌ পুলিশের ১২৪টি ফাঁড়ি দিয়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা সহজ নয়। অপরাধীরা এ সুযোগই নিচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর দুর্গম চরাঞ্চল ও জেলার সীমানাসংলগ্ন নদীপথে নিরাপত্তার ঘাটতি প্রকট হয়ে ওঠে।

এ পরিস্থিতিতে নদীপথে অপরাধ কমাতে ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। শুধু সনাতন পদ্ধতিতে টহল দিয়ে নদীপথে অপরাধের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থামানো যাবে না। অপরাধপ্রবণ নদীপথ, চরাঞ্চল এবং মরদেহ ফেলার সম্ভাব্য স্থানগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি নৌ পুলিশের জনবল, আধুনিক নৌযান, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নৌ পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, জেলা ও মহানগর পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি। অপরাধপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত যৌথ অভিযান চালিয়ে অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে। দেশের নদীপথ কোনোভাবেই অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হতে দেওয়া যায় না।