নিয়োগে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন

সম্পাদকীয়

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটেছে, তাকে আর নিছক ‘অনিয়ম’ বলে চালিয়ে দেওয়া ভদ্রতার অতিরঞ্জন হবে। বরং এটিকে নিয়ম ভাঙার এমন এক সুসংগঠিত প্রয়াস বলা ভালো।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশিকা যেখানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সিজিপিএ-৩.৬ নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেখানে এই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উদারহস্তে সেটিকে ৩.২৫-এ নামিয়ে এনেছে। ‘উদারতা’ এখানেই থেমে থাকলে হয়তো সেটিকে প্রশাসনিক ‘সহানুভূতি’ বলা যেত; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই শর্তও মানা হয়নি। এর চেয়েও কম যোগ্যতার প্রার্থীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এটি কি শিক্ষার মানোন্নয়নের কোনো অভিনব পদ্ধতি, নাকি মেধাহীনতার প্রতি একধরনের নীতিগত অনুরাগ?

অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক নিয়োগ, বিজ্ঞপ্তির এক পদে নিয়োগ দেখিয়ে অন্য পদে নিয়োগ সম্পন্ন—এসব ঘটনাকে যদি ‘ত্রুটি’ বলা হয়, তাহলে সত্যের প্রতি অবিচার হবে। বরং এগুলো এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে নিয়মকে ইচ্ছেমতো বাঁকিয়ে নেওয়া হয় এবং যোগ্যতার সংজ্ঞা ক্ষমতাধর লোকজনের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। আর উপাচার্যের জ্বালানি ব্যবহারের প্রসঙ্গে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা যেন এই অনিয়মের ষোলো কলা পূর্ণ করেছে।

দেখা গেছে, নির্ধারিত সীমার প্রায় দ্বিগুণ জ্বালানি ব্যয় দেখানো হয়েছে। ‘দাপ্তরিক প্রয়োজনে’ ঢাকায় যাতায়াতের মাধ্যমে এটিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এমন যুক্তি শুনে মনে হতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম বোধ হয় রাঙামাটি নয়; ঢাকাকেন্দ্রিক কোনো অদৃশ্য সদর দপ্তর থেকেই পরিচালিত হয়। নচেৎ এত ঘন ঘন যাতায়াতের এই রহস্য কী?

আমরা মনে করি, শিক্ষক নিয়োগে ন্যূনতম যোগ্যতার শর্ত লঙ্ঘন কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি একপ্রকার জ্ঞানবিরোধী অপরাধ। যে সমাজ তার শিক্ষকদের মানদণ্ডে আপস করে, সে সমাজ মূলত নিজের ভবিষ্যৎকে অবজ্ঞা করে। সিজিপিএর নির্ধারিত সীমা উপেক্ষা করে, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়োগ প্রদান—এসব কার্যক্রম প্রমাণ করে যে এখানে যোগ্যতার পরিবর্তে অন্য কোনো অদৃশ্য মানদণ্ড কার্যকর ছিল। এই মানদণ্ডের নাম যদি স্বজনতোষণ, পক্ষপাত কিংবা গোপন আনুগত্য হয়, তবে তা কেবল অনৈতিকই নয়; বরং রাষ্ট্রবিরোধী চেতনারও সমার্থক।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর একজন আরেকজনের দিকে নির্দেশ করছেন, অথচ কেউই চূড়ান্তভাবে জবাবদিহির দায় নিচ্ছেন না। এটি এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক অসততার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে জবাবদিহিকে বিভ্রান্তির গোলকধাঁধায় আবদ্ধ রাখা হয়। এ অবস্থায় নীরবতা কোনো বিকল্প হতে পারে না। প্রয়োজন কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সব নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন এবং অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।