জনদুর্ভোগ দূর করতে দ্রুত ব্যবস্থা নিন

সম্পাদকীয়

৯ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণকাজ তিন বছরেও শেষ হয়নি। কোথাও খানাখন্দ, কোথাও কাদা, আবার কোথাও ইটের খোয়া ফেলে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর সদরসহ অন্তত তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ৮০ হাজার মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। সড়কের বেহাল নিয়ে একজন বাসিন্দাকে মাইকিং করে জনপ্রতিনিধির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়েছে। এটি শুধু অভিনব প্রতিবাদ নয়; দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতারও করুণ চিত্র। একটি সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ার পরও যখন কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না, তখন মানুষকে এভাবেই নিজের দুর্ভোগের কথা জানাতে হয়।

 সড়কটির সংস্কারকাজের চুক্তিমূল্য ১৮ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৫ সালের মার্চ। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত করা হয়। সেই সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ হয়নি। এখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২৭ সালের মে পর্যন্ত তৃতীয় দফায় সময় চেয়েছে। অথচ এরই মধ্যে ৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। কাজের অগ্রগতি দেখানো হচ্ছে ৬৫ শতাংশ।

বিলম্বের জন্য ঠিকাদার বর্ষা ও গাছ কাটতে বন বিভাগের বিলম্বকে দায়ী করেছেন। কিন্তু বর্ষা বাংলাদেশে অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা নয়। কাজের সময়সূচি তৈরির সময় বর্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কথা। আবার গাছ কাটার জটিলতা থাকলে তা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সময়মতো সমন্বয় করা প্রয়োজন ছিল। এসব যুক্তি দিয়ে বছরের পর বছর নির্মাণকাজ ঝুলিয়ে রাখা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আরও উদ্বেগের বিষয়, এলজিইডির কর্মকর্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, ঠিকাদার অর্থবছরের শেষে চাপ প্রয়োগ করে বিল নিয়ে যান। এ অভিযোগ সত্য হলে বিল অনুমোদন ও কাজের তদারকির প্রক্রিয়া নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। কাজের বাস্তব অগ্রগতি ও মান যাচাই না করে কীভাবে এত টাকা পরিশোধ করা হলো?

একটি বেহাল সড়ক শুধু চলাচলের সমস্যা তৈরি করে না। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া, রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া, কৃষিপণ্য বাজারজাত করা এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, সবকিছুর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যানবাহনের ক্ষতি ও যাতায়াত ব্যয় বাড়ে। বর্ষায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়।

আমরা মনে করি, কর্তৃপক্ষের শুধু ‘এবার দ্রুত কাজ শেষ হবে’—এমন আশ্বাস দেওয়ার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট সময়সূচি করে দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে। ইতিমধ্যে পরিশোধ করা অর্থের বিপরীতে কাজের পরিমাণ ও মান স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। গাফিলতি প্রমাণিত হলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে চুক্তি অনুযায়ী জরিমানা ও অন্যান্য ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে তদারকিতে দায়িত্বহীনতার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। জনগণের অর্থে নির্মিত সড়কের জন্য জনগণকেই বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হবে—এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।