পর্যাপ্ত লোকবল, বাজেট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বোটানিক্যাল গার্ডেনের যে করুণ দশা সম্প্রতি প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক। রাবির উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠার সময় ১৯৬৪ সালে যাত্রা শুরু হওয়া প্রায় ১৫ একর বিস্তৃত এই গার্ডেন দীর্ঘ যাত্রাপথে দেশি-বিদেশি শত শত উদ্ভিদের সমাহারে জীববৈচিত্র্যের এক উন্মুক্ত ভান্ডারে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানে গার্ডেনে প্রায় ৭৮টি পরিবারের ৬০০ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। অথচ চরম অযত্ন ও অবহেলায় আজ এই গার্ডেন অকেজো হয়ে পড়ছে, গভীর ঝুঁকির মুখে পড়েছে এর জীববৈচিত্র্য।
একটি আন্তর্জাতিক মানের বোটানিক্যাল গার্ডেন পরিচালনার জন্য যেখানে নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন, সেখানে ১৫ একরের বিশাল এই চত্বর আগলে রাখার জন্য আছেন দুজন মালি ও একজন মাস্টাররোল কর্মচারী! ফলে ভেতরের অংশ ধীরে ধীরে জঙ্গলে পরিণত হচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব তো আছেই, এমনকি যে ঘাস কাটার মেশিনটি রয়েছে, সামান্য তেলের অভাবে তা–ও অকেজো পড়ে আছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, গার্ডেনের বেশির ভাগ গাছেই কোনো নেমপ্লেট নেই। মালিরা যেমন গাছগুলো ভালোভাবে চেনেন না, তেমনি গাছ চিনিয়ে দেওয়ার মতো কোনো অভিজ্ঞ লোকও সেখানে নেই। অ্যামাজন লিলির মতো অনেক দুষ্প্রাপ্য প্রজাতি ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। দুষ্প্রাপ্য আরও অনেক প্ল্যান্ট এখানে সংরক্ষিত না থাকায় উদ্ভিদবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে অনলাইনে বা ছবি দেখে শিখতে হচ্ছে, যা উচ্চশিক্ষার জন্য এক বড় অন্তরায়।
বাগানের নিরাপত্তার ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। নিচু প্রাচীর এবং অরক্ষিত সীমানার সুযোগ নিয়ে প্রতিনিয়ত চুরি হয়ে যাচ্ছে বাঁশ, ডালপালাসহ বিরল সব উদ্ভিদের জার্মপ্লাজম। প্রাচীর উঁচু করা বা সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
গার্ডেনের এই করুণ অবস্থার মূল কারণ হিসেবে অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দকে দায়ী করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয় না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান। একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন একটি মৌলিক অনুষঙ্গ কেন দিনের পর দিন বরাদ্দহীন ও অভিভাবকহীন থাকবে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।
রাবির বোটানিক্যাল গার্ডেনকে কেবল জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্যই টিকিয়ে রাখতে হবে তা নয়; বরং আমাদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার স্বার্থেই এ উদ্যানকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। অবিলম্বে জরুরি বাজেট বরাদ্দ, অবকাঠামোগত সংস্কার ও পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। আমরা আশা করি, রাবি প্রশাসন ও ইউজিসিসহ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই এই সম্পদ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।