তালাবদ্ধ কারখানায় আর কত শ্রমিকের মৃত্যু

সম্পাদকীয়

আমাদের শ্রমজীবী মানুষদের কতটা অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করা হয়, ঢাকার কেরানীগঞ্জে গ্যাসলাইটার কারখানায় ছয়জনের পুড়ে মরার ঘটনা তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বরাবরের মতো এবারের দুর্ঘটনার পরও জানা গেল, কারখানাটির কোনো অনুমতি ছিল না। এর চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, কারখানাটিতে কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না, অগ্নিকাণ্ডের সময় তালাবদ্ধ ছিল প্রধান ফটক। ফলে এটিকে কোনোভাবেই দুর্ঘটনা বলার উপায় নেই; বরং ধারাবাহিক কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ অধ্যায়।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত শনিবার বেলা একটার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের কদমতলী ডিপজল সড়কে আকরাম গ্যাসলাইটার কারখানায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দেড় ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরোপুরি আগুন নিভতে বিকেল পৌনে পাঁচটা বেজে যায়। কারখানার ভেতর থেকে ছয় শ্রমিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে এক সন্তান তাঁর মায়ের মরদেহ শনাক্ত করতে পেরেছেন হাতের মুঠোয় ধরা ঘরের চাবির গুচ্ছ দেখে। এ ছাড়া যে দুজন শ্রমিক দগ্ধ হয়ে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাঁদের যথাক্রমে ১৮ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এই অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিশ্চয়ই বেরিয়ে আসবে। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, স্থানীয় বাসিন্দা ও বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের ভাষ্যে এটা স্পষ্ট, শ্রমিকেরা যে পুড়ে অঙ্গার হবেন, তার সব ব্যবস্থাই সেখানে করা হয়েছিল। প্রধান ফটকে তালা লাগানো থাকায় দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের প্রাণ বাঁচাতে দেয়াল টপকে বাইরে বের হতে হয়েছে।

 বিউটেন, প্রপেনের মতো গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করার বিপজ্জনক কারখানা একটি জনবহুল এলাকায় কীভাবে চলতে পারে, সেটা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় গত বছর কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপরও কীভাবে কারখানাটি চালু হলো, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের অনুরোধের পরও মালিক কারখানাটি বন্ধ করতে বা সরিয়ে নিতে কোনো উদ্যোগ নেননি। আমরা মনে করি, কারখানামালিক, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর কেউই শ্রমিক মৃত্যুর দায় এড়াতে পারে না। এর পেছনে কারা দায়ী, তদন্তে অবশ্যই তার বিস্তারিত থাকতে হবে। এ ছাড়া রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কারও প্রশ্রয়ে কারখানামালিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাতে ও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পিছপা হননি, তদন্ত কমিটিকে অবশ্যই সেটা বের করতে হবে।

আমরা মনে করি, তালাবদ্ধ ঘরে শ্রমিক পুড়ে মরার এই দুঃখজনক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হওয়া জরুরি। এশিয়ার নবম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হিসেবে শ্রমিকদের জন্য এমন অনিরাপদ কর্মপরিবেশ জারি থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গত বছরের অক্টোবর মাসে রাজধানীর মিরপুরে আবাসিক এলাকায় অবৈধ ও বিপজ্জনক রাসায়নিকের গুদামে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন শ্রমিক নিহত হন। ছাদ বন্ধ থাকায় শ্রমিকেরা দম বন্ধ হয়ে মারা যান। ২০২৪ সালে বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যুরও বড় কারণ ছিল কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টের মূল ফটক তালাবদ্ধ করে দেওয়া।

লোভ ও মুনাফার কাছে নাগরিকের নিরাপত্তা ও জীবনের মূল্য যে কতটা তুচ্ছ, এসব ঘটনা তারই দৃষ্টান্ত। এই কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড অজস্র উদাহরণের বিপরীতে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার ও শাস্তি কার্যকর করার দৃষ্টান্ত নগণ্য। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই একের পর এক মানবিক ট্র্যাজেডির জন্ম দিয়ে চলেছে। কেরানীগঞ্জের গ্যাসলাইটার কারখানার মালিকসহ দায়ী সবার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নিহত শ্রমিক পরিবারগুলোকে দুই লাখ টাকা নয়, যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রয়োজন। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করাটাও জরুরি।