একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো পর্যাপ্ত খোলা জায়গা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার মাঠ। কিন্তু ঢাকা মহানগরীর বর্তমান বাস্তবতায় এই শর্ত যেন এক নিষ্ঠুর তামাশায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার শিশুপার্ক ও খেলার মাঠের যে চিত্র প্রথম আলোতে উঠে এসেছে, তা নাগরিক হিসেবে আমাদের লজ্জিত করে।
পুরান ঢাকার লালবাগ থেকে শুরু করে মোহাম্মদপুর—সর্বত্রই একই করুণ দশা। লালবাগে শিশুদের খেলার দোলনা তালাবদ্ধ করে রাখার মতো অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, পার্ক যদি শিশুদের জন্য উন্মুক্তই না থাকে, তবে এই অবকাঠামোর পেছনে জনগণের ট্যাক্সের টাকা ব্যয়ের সার্থকতা কোথায়? নবাবগঞ্জ ও হাজারীবাগের শিশুরা ভাঙা দোলনায় টায়ার বা দড়ি বেঁধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খেলছে। এটি কেবল একচিলতে বিনোদনের জন্য তাদের হাহাকার নয়, বরং আমাদের নগর কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। লালমাটিয়া ত্রিকোণ পার্কের স্কেটিং গ্রাউন্ডটি এখন ডোবায় পরিণত হয়েছে, যা মশার প্রজননকেন্দ্রে রূপ নিয়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, খেলার মাঠের অভাবে শিশুরা ক্রমেই চার দেয়ালের মাঝে বন্দী হয়ে পড়ছে। এর ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে বাড়ছে স্থূলতা ও চোখের সমস্যার মতো শারীরিক জটিলতা, অন্যদিকে স্মার্টফোনের প্রতি আসক্তি তাদের সামাজিক দক্ষতা কমিয়ে দিচ্ছে। পার্কগুলোতে যখন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ভাঙা সরঞ্জামের আধিপত্য থাকে, তখন অভিভাবকেরাও সন্তানদের সেখানে নিতে ভয় পান। ফলে আমাদের অজান্তেই আমরা এক বিষণ্ন ও অন্তর্মুখী প্রজন্ম তৈরি করছি।
এসব পার্ক রক্ষণাবেক্ষণে সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর চরম অনীহা দৃশ্যমান। নির্মাণের পর তদারকি না থাকায় কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম অকেজো হয়ে যাচ্ছে। পার্কের ভেতর ময়লার স্তূপ বা নর্দমার পানি জমে থাকা প্রমাণ করে যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো কার্যকর মনিটরিং নেই। এটি খুবই হতাশাজনক ও দুঃখজনক।
প্রতিটি মাঠ ও পার্কে আগামী সাত দিনের মধ্যে সংস্কারকাজ শুরু করতে হবে। ভাঙা সরঞ্জাম সরিয়ে আধুনিক ও নিরাপদ সামগ্রী স্থাপন করতে হবে। মাঠ ও পার্ক তালাবদ্ধ রাখা যাবে না। পার্ক ও মাঠগুলোকে দখলমুক্ত ও আধুনিকায়ন করে শিশুদের জন্য ফিরিয়ে দিন। আধুনিকায়ন করতে গিয়ে প্রকল্পের নামে যেন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি না হয়, সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। প্রতিটি পার্কের জন্য স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের নিয়ে একটি তদারকি কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করবে।