সেতু ও সড়কের কাজ আবারও চালু করুন

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশে বহু উন্নয়ন প্রকল্প বারবার এমন এক দুষ্টচক্রে আটকে পড়ে, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, দুর্বল প্রশাসনিক নজরদারি এবং জবাবদিহির অভাব মিলেমিশে জনগণের প্রত্যাশাকে ব্যর্থ করে দেয়। পটুয়াখালীতে ৭৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ৫৫টি সেতু ও সাতটি সড়কের কাজ ২২ মাস ধরে বন্ধ থাকার ঘটনা সেই পুরোনো বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ।

এই কাজ বন্ধ হওয়ার কারণ শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর ঠিকাদারি ব্যবস্থা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) দেওয়া তথ্য বলছে, ২২টি প্যাকেজের অধীনে এসব কাজের মূল ঠিকাদার ছিল সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশত্যাগ করেন, ব্যাংক হিসাব জব্দ হয়, আর সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায় উন্নয়ন প্রকল্প। প্রশ্ন হলো, একটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্প কীভাবে একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক ভাগ্যের সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে?

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগ কাজ অনেক দূর এগিয়ে গিয়েও থেমে আছে। কোথাও সেতু নির্মাণ শতভাগ শেষ হয়েছে, কিন্তু সংযোগ সড়ক নেই। কোথাও সড়কে শুধু ইটের খোয়া বা সুরকি ফেলে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে যে অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, তা জনগণের কোনো কাজে আসছে না। উন্নয়ন প্রকল্পের এই অদক্ষতা শুধু অর্থের অপচয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ব্যর্থতার প্রতীক।

এখানে প্রশাসন কার্যত অসহায় অবস্থানে রয়েছে। এলজিইডি বলছে, আদালতে মামলা চলমান থাকায় তারা চুক্তি বাতিল করতে পারছে না, নতুন সিদ্ধান্তও নিতে পারছে না। অর্থাৎ সরকারি প্রকল্প এখন একধরনের আইনি জটিলতার জালে আটকে গেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এসব ব্যাখ্যা খুব সামান্যই গুরুত্ব বহন করে। তাদের কাছে বাস্তবতা হলো সেতু আছে, কিন্তু চলাচল করা যায় না; রাস্তা সংস্কার শুরু হয়েছে, কিন্তু এখন সেটি আগের চেয়েও বিপজ্জনক।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকল্প অনুমোদনের সময় ঠিকাদার নির্বাচনে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল? যদি একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে এত বড় প্রকল্প দেওয়া হয়? এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রকল্পে যোগ্যতা নয়, রাজনৈতিক সংযোগই বড় বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়।

এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সরকারকে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। আদালতের জটিলতা নিরসনে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রয়োজনে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই নতুন ঠিকাদার নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ঠিকাদারি দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।