যাত্রীনিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

সম্পাদকীয়

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নতুন করে আমাদের সামনে একটি পুরোনো কিন্তু ক্রমেই আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠা বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত ও আহত—তিন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার ভাষায় একটি সংকটকে তুলে ধরে না; এ এটি নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র ও সরকারের দায়হীনতারও প্রকাশ।

২০২৫ সালে সড়কে ৬ হাজার ৭২৯টি দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ১৫ হাজার মানুষের আহত হওয়ার তথ্য কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই; বরং এটি একটি জাতীয় বিপর্যয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো প্রায় ৩৮ শতাংশ নিহতের সঙ্গে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে। মোটরসাইকেলকে গণপরিবহন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার যে ভুল নীতি, জীবন দিয়ে তারই খেসারত দিতে হচ্ছে নাগরিকদের।

সড়ক, রেল ও নৌপথে মিলিয়ে এক বছরে ৭ হাজার ৩৬৯টি দুর্ঘটনায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানি যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও ট্র্যাজেডির বিষয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের আলাপে অবকাঠামো, সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে আর মেগা প্রকল্পের তালিকা দীর্ঘ হলেও সড়কনিরাপত্তা নিয়ে তেমন তৎপরতা দেখা যায় না। যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিবের দাবি, সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যানের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি।

সড়কনিরাপত্তা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই। আমরা আশা করি, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সড়কনিরাপত্তা, গণপরিবহন সংস্কার ও যাত্রী অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর যে পরিমাণ মানুষ প্রাণ হারান, তা অনেক সময় বড় কোনো জাতীয় দুর্যোগের চেয়ে বেশি। অথচ এই মৃত্যু যেন ভোটের রাজনীতিতে কোনো মূল্যই পায় না।

প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা, সড়কনিরাপত্তায় বাজেট বাড়ানো এবং আধুনিক গণপরিবহন–ব্যবস্থার দিকে যাওয়াসহ ১২ দফা সুপারিশ করেছে যাত্রীকল্যাণ সমিতি। এসব সুপারিশ প্রশাসনের বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। এগুলো বাস্তবসম্মত, প্রয়োগযোগ্য এবং বহুদিনের দাবি।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। এখনই যদি সড়কনিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা না করা হয়, তাহলে উন্নয়ন ও জনস্বার্থ নিয়ে প্রশাসনের সব দাবি মানুষের কাছে ফাঁকা বুলি হয়েই থেকে যাবে।

আমরা আশা করি, সড়কে, নৌপথে, রেলপথে যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার, প্রশাসন ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো উদাসীনতার পথ থেকে সরে আসবে। আমরা মনে করি, বেশির ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা প্রতিরোধযোগ্য। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সড়কে মৃত্যুর মিছিল অবশ্যই কমিয়ে আনতে হবে।