রাঘববোয়ালেরা কেন আইনের বাইরে

সম্পাদকীয়

সরকারের নানামুখী অভিযান ও তৎপরতার মধ্যেও সিলেট অঞ্চলে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না। প্রথম আলোর সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখা যায়, সিলেটের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ও ইজারা বন্ধ থাকা কোয়ারি থেকে  অবাধে পাথর তোলা হচ্ছে। হাজার হাজার শ্রমিক নদীর পাড়ে জমা করে রাখা পাথর টুকরিতে ভরে বাল্কহেডে ওঠাচ্ছেন। এমনকি কোথাও কোথাও খননযন্ত্র দিয়ে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে।

২০২০ সালে পাথর উত্তোলনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর লুটেরা গোষ্ঠী কৌশল বদলিয়েছে। নিলামে বিক্রি হওয়া পাথর স্থানান্তর করার সুযোগে হাজার হাজার ঘনফুট পাথর লুট করে নিচ্ছে তারা। এসব পাথর লুটের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিকেরা যেমন জড়িত, তেমনি স্থানীয় প্রশাসনেরও সায় আছে। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর স্থানীয় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দলের নেতারা পাথর লুটপাটের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ আছে। বাদ যাননি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরাও। আদর্শের দিক থেকে পরস্পরবিরোধী এসব দলের নেতাদের মধ্যে এই একটি বিষয়ে আশ্চর্য মতৈক্য আছে। পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর লুটের বিষয়ে একটা ঐক্য গড়ে ওঠে, সেই ঐক্যের বিপরীতে স্থানীয় প্রশাসন হয়তো যোগসাজশ করেছে, তা না হলে নীরব থেকেছে বা দুটিই করেছে।

রাতের আঁধারে ভোলাগঞ্জ কোয়ারি থেকে পাথর লুট হয়ে যাওয়ার ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর সরকার যে অভিযান চালায়, তার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে লুট হওয়া পাথর রাতের আঁধারে কোয়ারিতে ফেরত আসা, অন্যদিকে নিয়মিত পাথর উত্তোলনের মহড়া— দুটিই চলছে।

স্থানীয় প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে কোয়ারি ইজারা বন্ধের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত নদীর দুই পাড় এবং আশপাশে থাকা প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ ঘনফুট পাথর জব্দ করে। এর মধ্যে ৪৪ লাখ ঘনফুট পাথর ওই বছরই নিলামে তোলা হয়। নিলামে পাথর কেনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক কামরুল হাসান চৌধুরী একসময় সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সক্রিয় নেতা ছিলেন। তাঁকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের ২০ থেকে ৩০ জন নেতা-কর্মী পাথর লুটে জড়িত। আবার কোনো কোনো দলের শীর্ষ ও স্থানীয় নেতারা  নির্বিচার পাথর লুটের পক্ষেও সাফাই গেয়েছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের বিভাগীয় সমন্বয়কারী শাহ সাহেদা আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিলামের বৈধ কাগজটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি চক্র কোয়ারি ও আশপাশের এলাকায় নির্বিচার লুটপাট চালাচ্ছে।’

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারির পাথর লুট ও চুরির ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। তারা দেড় হাজার আসামি খুঁজে বের করে পাথর লুটের বিচার করবে, এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। সমস্যা হলো এসব ঘটনায় শ্রমিক শ্রেণির লোকেরাই ধরা পড়েন; যাঁরা মালিকের পক্ষে দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু পাথর লুটের পরিকল্পনাকারী রাঘববোয়ালেরা বরাবর ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান। 

পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি লোকদেখানো বলে দাবি করেছেন পরিবেশবিদেরা। যখনই পাথর লুট নিয়ে হইচই হয়, তখন প্রশাসন কিছুটা নড়েচড়ে বসে। একদিকে পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান, অন্যদিকে নির্বিচার পাথর উত্তোলন—এই দ্বৈতনীতি চলতে পারে না। কোয়ারি থেকে পাথর লুট বন্ধ করতে হলে নেপথ্যের কুশীলবদের আইনের আওতায় আনতে হবে।