জলবায়ুঝুঁকি মোকাবিলায় অনুকরণীয় মডেল

সম্পাদকীয়

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদে এটি এক রূঢ় বাস্তবতা। বিশেষ করে উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর মতো চরাঞ্চলগুলোতে কৃষিকাজ এখন জীবন–মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে দুধকুমার নদের অব্যাহত ভাঙন, অন্যদিকে খোলা আকাশের নিচে কাজ করার সময় হঠাৎ বজ্রপাত—এই দুই সংকটে দিশাহারা চরাঞ্চলের মানুষ। এমন প্রেক্ষাপটে নাগেশ্বরীর বেরুবাড়ী ইউনিয়নে স্থাপিত একটি ‘কৃষকছাউনি’ কৃষকের জীবন সুরক্ষায় আশার সঞ্চার করেছে।

বিগত কয়েক বছরে এই ইউনিয়নে বজ্রপাতে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, অনেকে আহত হয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় খোলা চরে কৃষকদের নিরাপত্তা কতটা নাজুক। সেখানে একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে স্থাপিত বজ্রনিরোধক দণ্ডসংবলিত এই কৃষকছাউনি চরের বলরামপুরসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। এটি কেবল দুর্যোগের সময় কৃষকদের নিরাপদ আশ্রয়ের ঠিকানাই নয়, বরং তপ্ত দুপুরে বিশ্রামের জন্য একটি মানবিক কেন্দ্রও বটে।

একই সঙ্গে ওই এলাকায় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীন নারীদের সরকারি রাস্তার পাশে ‘মালচিং’ পদ্ধতিতে সবজি চাষের উদ্যোগটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, সম্পদ সীমিত হলেও সদিচ্ছা থাকলে প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো ৩০টি পরিবারের এই ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই টেকসই উন্নয়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তবে প্রশ্ন হলো, এ ধরনের জীবন রক্ষাকারী ও অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলো কেন কেবল নির্দিষ্ট কিছু এনজিও বা ব্যক্তিগত দানশীলতার ওপর নির্ভর করবে? চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠগুলোতে, যেখানে বসতবাড়ি অনেক দূরে, সেখানে এমন আধুনিক কৃষকছাউনি নির্মাণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাত এখন জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। তাই চরাঞ্চলে কৃষকদের সুরক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে পরিকল্পিতভাবে প্রতিটি বড় চরে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থাসংবলিত স্থায়ী কৃষকছাউনি নির্মাণ করা জরুরি।

নাগেশ্বরীর এই উদ্যোগ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। জলবায়ু অভিযোজন কেন্দ্র বা বীজভান্ডারের মতো কাজগুলো যদি স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে আরও জোরালোভাবে সমন্বয় করা যায়, তবে এর স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়বে। ভূমিহীনদের সরকারি জমি ব্যবহারে অনুমতি দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ যেমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তেমনি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদেরও উচিত চরাঞ্চলের এই ‘সারভাইভাল মডেল’ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া।

কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এই স্লোগান যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। চরের খোলা আকাশের নিচে বজ্রপাতের আতঙ্ক নিয়ে নয়, বরং নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে আমাদের কৃষকেরা সোনালি ফসল ফলিয়ে যাক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।