লেখক-প্রকাশক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিদের এভাবে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা আদালতের এবং সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুতর গলদকে সামনে নিয়ে এসেছে। ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার আদালতগুলোতে প্রতিদিন সাড়ে ছয় শ আসামি হাজির করা হয়। পৃথক চারটি হাজতখানা থেকে আসামিদের আদালতগুলোতে হাজির করা হয়। এ কাজে ১৯০-২০০ জন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা কম, নিরাপত্তার এ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছেন জঙ্গিরা।

জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে জেএমবির তিনজন সদস্যকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের অভিজ্ঞতা যখন রয়েছেই, তখন জঙ্গির মতো সংঘবদ্ধ ও ধর্মীয় মতাদর্শ দ্বারা উদ্দীপিত অপরাধীদের ক্ষেত্রে কেন বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। এ গাফিলতির দায় কে নেবে?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলেছে, জঙ্গিরা হাতকড়া খুলে পালিয়েছেন। তাঁদের কাছে কীভাবে হাতকড়ার চাবি গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। জঙ্গিদের পালিয়ে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, দুটি মোটরসাইকেলে করে তাঁরা পালিয়ে যাচ্ছেন।

পুরান ঢাকার মতো একটি জনাকীর্ণ এলাকা দিয়ে কীভাবে তাঁরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পারলেন, তা নিয়েও জনমনে নানা সংশয় দেখা দিয়েছে। ফয়সল আরেফিনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে, এটা খুবই অস্বাভাবিক ঘটনা।

পালানো জঙ্গিদের ধরতে সারা দেশে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে আদালতের নিরাপত্তাব্যবস্থাও। ঘটনা তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের প্রধান মেজর (বরখাস্ত) সৈয়দ জিয়াউল হকের পরিকল্পনায় ১৮ সহযোগী মিলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিয়েছেন। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে আদালতের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের একজন পরিদর্শকসহ পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থাকে শিথিল রেখে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া কার্যত অর্থহীন।

জঙ্গি দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে। গত কয়েক বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছে, জঙ্গিদের বড় কোনো কিছু করার সক্ষমতা নেই।

কিন্তু জঙ্গিদের বিভিন্ন সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ও জঙ্গি দমন কার্যক্রমের নানা দিক নিয়ে জনমনে অনেক প্রশ্নও রয়েছে। সবার নাকের ডগায় আদালত প্রাঙ্গণের মতো স্পর্শকাতর এলাকা থেকে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্ন ওঠা খুবই সংগত।

পলাতক জঙ্গিদের দ্রুত আটক ও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনা কেন ঘটল তা বের করা জরুরি।