অবিলম্বে নির্মাণকাজ বন্ধ করা প্রয়োজন

সম্পাদকীয়

গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান নামে সংরক্ষিত বনটি একসময় ঢাকার উপকণ্ঠে প্রাকৃতিক স্বস্তির একটি প্রতীক ছিল। এখন সেখানে গর্জে উঠছে খননযন্ত্র। শালগাছের সারি, বানরের দল আর নিস্তব্ধ প্রকৃতির বুক চিরে তৈরি করা হচ্ছে বর্জ্য ফেলার অবকাঠামো। এটি নিশ্চিত করেই আইনের প্রতি অশ্রদ্ধার প্রতিফলন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সংরক্ষিত বনের ভেতরে একটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এসটিএস মূলত শহরের বর্জ্য অস্থায়ীভাবে জমা রাখার স্থান, যা পরে চূড়ান্ত ভাগাড়ে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরনের একটি স্থাপনা কেন একটি জাতীয় উদ্যানে, তা–ও সংরক্ষিত শালবনের ভেতরে নির্মাণ করতে হবে?

আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুতর। বন আইন, ১৯২৭ অনুযায়ী ঘোষিত সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া প্রবেশই নিষিদ্ধ। অন্যদিকে বন্য প্রাণী (নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ) আইন অনুযায়ী জাতীয় উদ্যানে ময়লা ফেলা বা স্তূপ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি এর দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো শিল্প বা বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে। অথচ এই প্রকল্পে কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি, যা পরিবেশ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেই আইন অমান্য করে এই কাজ করছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাধা দেওয়ার পরও গায়ের জোরে দেয়াল ভেঙে কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটি কেবল প্রশাসনিক অসংগতি নয়; বরং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহির ঘাটতির উদাহরণ। 

গাজীপুরে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সংগ্রহ করতে পারে সিটি করপোরেশন। বাকি বর্জ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে। এই বাস্তবতা নিঃসন্দেহে একটি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। কিন্তু সেই সমাধান যদি পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে আসে, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

গবেষণা বলছে, গত দুই দশকে গাজীপুরের বনভূমি দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের চাপেই এই অবস্থা। এই প্রেক্ষাপটে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের মতো অবশিষ্ট বনাঞ্চল রক্ষা করা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। সেখানে যদি সরকারি উদ্যোগেই ভাগাড় নির্মাণ শুরু হয়, তবে ভবিষ্যতে এই বন আর টিকবে কি না, তা নিয়েই শঙ্কা দেখা দেয়। এ ছাড়া এর প্রতিবেশগত নেতিবাচক প্রভাবও হবে মারাত্মক। কেননা, বনের স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থানকে বিষিয়ে তুলতে পারে, এমন অনেক উপাদান সংগৃহীত বর্জ্যে থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। আপাতত স্বস্তির বিষয় হলো পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে এই ভাগাড় নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

সিটি করপোরেশনের যুক্তি—জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন। কিন্তু আইন অনুযায়ী, জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ব্যক্তিগত জমিতেও স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অর্থাৎ মালিকানা এখানে অজুহাত হতে পারে না। পরিবেশ অধিদপ্তরও তাদের প্রতিবেদনে এই নির্মাণ না করার পরামর্শ দিয়েছে।

আমরা মনে করি, এখানে মূল সমস্যা হলো পরিকল্পনার অভাব। গাজীপুরের মতো একটি দ্রুত বর্ধনশীল শহরের জন্য আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। কিন্তু সেটা হতে হবে পরিবেশসম্মত, আইনসম্মত এবং টেকসই। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান শুধু একটি বন নয়; এটি জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল, নগরবাসীর শ্বাস নেওয়ার জায়গা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ। এই বন ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।

সিটি করপোরেশনের অবিলম্বে এই নির্মাণকাজ বন্ধ করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে পরিবেশবান্ধব বিকল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পথ খুঁজতে হবে।