একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনের পর নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাত ও মারামারির ঘটনা অপ্রত্যাশিত ও দুঃখজনক। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর শুক্র ও শনিবার দেশের কয়েকটি আসনে বিচ্ছিন্ন সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় ও নতুন রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্যবর্তী এই সময়টা আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে এমনিতেই সংবেদনশীল। আমরা মনে করি, শুরুতেই এ ধরনের সংঘাত থামানো না গেলে তা জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ৮ জেলায় ১০টির বেশি আসনে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় দুজন নিহত এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। নির্বাচনের পরের দিন মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীর এক সমর্থককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের একজন নেতার নেতৃত্বে এ হামলা চালানো হয়। বাগেরহাট-২ আসনেও বিএনপির প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের হামলায় বিদ্রোহী প্রার্থীর এক সমর্থক নিহত হয়েছেন। ছয়টি স্থানে জামায়াতের নেতা-কর্মীদের ওপর বিএনপির নেতা-কর্মীদের, দুটি জায়গায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর নেতা-কর্মীদের ওপর বিএনপির নেতা-কর্মীদের এবং একটি জায়গায় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সমর্থকদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সহিংসতা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর সংযত আচরণ ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করেছিল। সেই ধারাবাহিকতাতেই নির্বাচনের দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখা যায়। নির্বাচনের পর দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি আসনে বিজয়ী প্রার্থী পরাজিত প্রার্থীর সঙ্গে দেখা করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। পরাজিত প্রার্থীরাও অনেক জায়গায় বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে দেখা করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এই সৌহার্দ্যমূলক আচরণই গণতন্ত্রের মূল চেতনা। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে, রাজনীতিবিদদের আচরণের পরিবর্তন তারই প্রতিফলন।
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পাওয়ার পরও বিএনপির আনন্দমিছিল ও সভা না করার সিদ্ধান্তটি ছিল ইতিবাচক। কেননা নির্বাচনের পর এ ধরনের শোভাযাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি করে। এরপরও কয়েকটি আসনে সংঘাত ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। আমরা মনে করি, বিজয়ী দল হিসেবে এ ধরনের সংঘাত বন্ধে বিএনপির বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। দলটির তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের প্রতি জরুরি ও শক্ত বার্তা দেওয়া প্রয়োজন যে এ ধরনের সংঘাত ও নাগরিকদের ওপর আক্রমণ ফৌজদারি অপরাধ। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং কোনো ধরনের সহিংসতা, প্রতিশোধ বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। তাঁর এই বক্তব্য বিএনপির তৃণমূলে বার্তা দেবে বলেই আমরা আশা করি।
বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস বলে, শুধু নির্বাচনের দিনটা নয়; পরের কয়েকটি দিনও আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার দিক থেকে নাজুক সময়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আজ রোববার পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে থাকছে। নির্বাচন-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
এটা দুঃখজনক, কোনো কোনো গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাতের ঘটনাগুলো নিয়ে নানা অপতথ্য ও ভিডিও ছড়াচ্ছে। এ ধরনের অপতথ্য যেকোনো সময় সহিংসতা উসকে দিতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দল—সবাইকেই এ ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাত ও মারামারির সব কটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি। শুরুতেই কঠোর না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে। সংঘাত নয়, সহাবস্থান জরুরি।