দীর্ঘ দুই দশক পর বড় স্বপ্ন ও মানুষের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে প্রথম বাজেট পেশ করল বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। নানা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে মানুষ তাকিয়ে ছিল নতুন সরকারের এই বাজেটের দিকে। বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব করেন। অর্থনীতিবিদ, বিশ্লেষক, পর্যবেক্ষক, ব্যবসায়ী মহল ও সচেতন নাগরিক মহলে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, প্রস্তাবিত এই বাজেট সরকার কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে এবং মানুষের প্রত্যাশা তা কতটা পূরণ করতে পারবে।
এবারের বাজেটের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। বাজেট বক্তৃতাটি সন্দেহাতীতভাবে সুলিখিত। এতে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, ফ্রিল্যান্সার ও স্টার্টআপদের জন্য বড় ছাড়, সৌরবিদ্যুৎ ও পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহনে (ইভি) ব্যাপক প্রণোদনা এবং নিত্যপণ্যের উৎসে কর কমানোর মতো কিছু চমৎকার স্বস্তিদায়ক জনমুখী উদ্যোগ রয়েছে। বিপুল নিত্যপণ্যের উৎসে কর কমানোর প্রস্তাবের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে নজির সৃষ্টি করেছে সরকার। কৃষকের সার ও কীটনাশক খরচ কমাতেও কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার জাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ চান দৃশ্যমান স্বস্তি ও কাজের প্রতিফলন। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের উৎসে কর কমানোর প্রভাব কতটা বাজারে পড়বে, সেই প্রশ্ন তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার ছড়াছড়ি থাকলেও তা অর্জনের কৌশলগত দিকনির্দেশনার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৭ শতাংশে নামানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ করার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন; গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয়, লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিনই বলতে হবে।
বাজেটের বড় উদ্বেগের জায়গা হলো এর অতিমাত্রায় ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে যেখানে বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তির পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৮ হাজার কোটি টাকা, সেখানে নতুন বাজেটে তা প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎস তথা ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নির্ধারণ করেছে, তা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে আরও সংকুচিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে আর্থিক ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় জরুরি। নয়তো এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে। তবে ব্যবসা সহজ করার নানা উদ্যোগ, সম্ভাবনাময় খাতে বন্ড সুবিধা, ছোট ব্যবসায়ীদের ছাড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বিপুল পণ্যের ওপর শুল্কহার বাড়ানো হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দেশীয় উৎপাদনকারী ও উদ্যোক্তারা নিঃসন্দেহে লাভবান হবেন।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা এনবিআরকে দেওয়া হয়েছে, বর্তমান ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিতে তা কতটা আদায়যোগ্য, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী কর, মূসক, কাস্টমস শুল্ক, বন্ড ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা আধুনিকায়নের যে একগুচ্ছ সংস্কার কর্মসূচির ঘোষণা দেন, তার যথাযথ বাস্তবায়নের প্রতি সরকারের অধিক মনোযোগী হতে হবে।
প্রতি অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখা নিয়ে নানা সমালোচনা দেখা যায়। এবার প্রস্তাবিত বাজেটে আপাতত কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়নি। বিষয়টিকে ‘সতর্ক সাধুবাদ’ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে শিক্ষা খাতেও। এতে স্পষ্ট, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতের মানোন্নয়নে বিএনপি সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
বাজেটে আন্তরিকতার খণ্ড খণ্ড প্রয়াসকে এক সুতায় গাঁথতে জরুরি সামগ্রিক কৌশল প্রণয়ন। একটি নতুন নির্বাচিত সরকারের পক্ষে রাতারাতি সব সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়, এটি সত্য; তবে সংকটের সঠিক রোগনির্ণয় ও তা মোকাবিলায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা আশা করি, সরকার কেবল কথার মায়াজালে মানুষকে না ভুলিয়ে, দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়ের অদক্ষতা দূর করে এই বাজেটকে সত্যিকার অর্থেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক অর্থনীতির হাতিয়ার হিসেবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে।