শিক্ষকদের বাড়তি কাজ থেকে মুক্তি দিন

সম্পাদকীয়

দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক। সেই শিক্ষক যখন পাঠদান ছেড়ে ভোটার তালিকা, জরিপ, তথ্য সংগ্রহ বা নানা প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো শিক্ষাকাঠামো। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নির্ধারিত শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ৩৭ ধরনের পেশাবহির্ভূত কাজ করতে হয়। এই তথ্য পাওয়া গেছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির সাম্প্রতিক সমীক্ষায়।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, ওই ৩৭ ধরনের পেশাবহির্ভূত কাজে যুক্ত থাকতে হচ্ছে প্রায় ৮৭ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষকদের। মাসে গড়ে একজন শিক্ষক প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন এমন কাজে, যার সঙ্গে শিক্ষার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। এই সময়টা যদি শ্রেণিকক্ষ, প্রস্তুতি, মূল্যায়ন বা পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাসে ব্যয় হতো, তাহলে প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র নিঃসন্দেহে ভিন্ন হতে পারত।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। অধিকাংশ শিক্ষকই মনে করেন, শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয় ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না এবং পরীক্ষার ফলও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেসব শিশু সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য রেমিডিয়াল ক্লাস অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অথচ ৮৫ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, কাজের চাপে তাঁরা এই অতিরিক্ত সহায়তা দিতে পারছেন না।

এই পরিস্থিতি কেবল শিক্ষার মানের প্রশ্ন নয়, এটি শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্নও। দীর্ঘ সময় অপ্রাসঙ্গিক কাজে যুক্ত থাকলে হতাশা, ক্লান্তি ও আগ্রহহীনতা তৈরি হয়। একজন সহকারী শিক্ষক প্রতি মাসে যে সময় পেশাবহির্ভূত কাজে দেন, তার আর্থিক মূল্য প্রায় চার হাজার টাকার সমান। কিন্তু এই ক্ষতির হিসাব কেবল টাকায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক কোটি শিক্ষার্থীর শেখার ভবিষ্যৎ।

সমীক্ষায় যে পাঁচটি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো নতুন কিছু নয়, বরং দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা ন্যূনতম দাবি। ক্লাস চলাকালে তথ্য সংগ্রহ বা প্রশাসনিক কাজ না চাপানো, প্রতিটি বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী নিয়োগ, একক ডিজিটাল পোর্টাল চালু করা, শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া এবং পাঠদানের সময় সুরক্ষানীতি প্রণয়ন করা—এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নযোগ্য এবং প্রয়োজনীয়।

প্রাথমিক শিক্ষা কোনো পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র নয়। এখানেই ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি হয়। শিক্ষক যদি শিক্ষাদানের পূর্ণ সুযোগ না পান, তাহলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। আমরা আশা করি, এই সমীক্ষায় উঠে আসা ভয়াবহতাকে আমলে নিয়ে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিলম্ব করবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের সময় রক্ষা করা মানে শিক্ষার টেকসই ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।