বিদ্যুৎ–জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে

সম্পাদকীয়

আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি যে কত বড় সংকট তৈরি করতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ তা আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করলে এবারের যুদ্ধ শুরু হয়। ছয় দিন পর এসে দেখা যাচ্ছে, পাল্টাপাল্টি হামলার এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে জ্বালানির যে চাহিদা; তার সিংহভাগ আসে সৌদি আরব, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।

যুদ্ধের কারণে এসব দেশে জ্বালানির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। শুধু আলোকসজ্জা বন্ধ ও ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করার অনুরোধ নয়; সরকারকে অবশ্যই জ্বালানি সাশ্রয় ও চুরি বন্ধে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ তার জন্মের ৫৪ বছর পার করলেও কোনো সরকারই জ্বালানি নিরাপত্তা ও দেশীয় উৎসকে গুরুত্ব দিয়ে একটি জাতীয় জ্বালানি নীতি দাঁড় করাতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে দায়মুক্তি আইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে দেশি–বিদেশি গোষ্ঠীর লুণ্ঠনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। জ্বালানির প্রাথমিক উৎস নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও সর্বোচ্চ চাহিদার ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করাটাই দুরূহ হয়ে যায়।

আমদানিনির্ভর ও বিদেশনির্ভর জ্বালানি নীতি যে জ্বালানি নিরাপত্তায় কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বহু বছর ধরেই অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছিলেন। ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময় জ্বালানির সংকট তীব্র হয়। উচ্চ ব্যয়ে জ্বালানি আনতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে। সামষ্টিক অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর তার প্রভাব পড়ে। নির্বাচিত নতুন সরকারকে অবশ্যই বর্তমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশীয় উৎসনির্ভর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রাধান্য দিয়ে জ্বালানি নীতি করতে হবে।

এবারে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ আমাদের দেশে গরমের সময়টাতে শুরু হয়েছে। এ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই চার থেকে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বেড়ে যায়। বর্তমান সংকট বৈশ্বিক; এর প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারত, পাকিস্তান, জাপানসহ অনেক দেশই গ্যাসের রেশনিং শুরু করেছে।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর। আর গ্যাস চাহিদার ৩৫ শতাংশ আসে আমদানীকৃত এলএনজি থেকে। বর্তমানে দেশে জ্বালানির যে মজুত ও সরবরাহ, তাতে মার্চ মাস পর্যন্ত চলবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি নিয়ে অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশকে বড় সংকটে পড়তে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে জ্বালানি সাশ্রয় ও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি কেনার পথ খোঁজাটাই সমাধান।

ঢাকার বিভিন্ন পাম্পে জ্বালানি তেল বিক্রির লাইনে অনেকে ভিড় করছেন এবং চাহিদার চেয়েও বেশি তেল কেনার চেষ্টা করছেন। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ক্রেতারা তেলের পাম্পগুলোতে ছুটলে সংকট আরও বাড়তে পারে। বর্তমান বাস্তবতায় সবাইকে ধৈর্যশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়।

আমরা মনে করি, বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের জ্বালানি সাশ্রয় নীতিকে সহযোগিতা করা নাগরিকদের দায়িত্ব। বৃহত্তর স্বার্থেই সাময়িক লোডশেডিংয়ের মতো ভোগান্তি নাগরিকদের মেনে নেওয়া উচিত। সবাইকে এটা মনে রাখা জরুরি, যার যার অবস্থান থেকে সহযোগিতা না করলে এ সংকট থেকে উত্তরণ পাওয়া কঠিন।