শান্তিপূর্ণ ও উৎসাহজনক পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ২৯৯টি আসনে ভোটাররা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোট গ্রহণের চিত্র সারা দেশের সব আসনে একই রকম ছিল না। ভোটার উপস্থিতি কোথাও ছিল বেশি, আবার কোথাও কম। বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়ম ও সহিংসতার খবরও পাওয়া গেলেও সামগ্রিক ভোটচিত্রে বড় ব্যত্যয় ঘটার মতো খবর পাওয়া যায়নি।
সরকার পরিচালনার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম গুরুদায়িত্ব ছিল একটি নির্বাচন আয়োজনের। জাতিকে একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ। ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনসহ নির্বাচন কমিশনের নেওয়া পদক্ষেপগুলো কার্যকর ছিল। সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর নানা উদ্যোগ ও তৎপরতা ভোটকেন্দ্রগুলোকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিয়েছে। এসব বিভিন্ন পদক্ষেপ ভোটারদের শঙ্কাহীন চিত্তে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করে দেয়।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে গণতন্ত্রে ফেরার যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো প্রচারণার ক্ষেত্রেও যে সহনশীল ও ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করেছিল, ভোটের দিনও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে উৎসাহিত করেছে। নারী ও তরুণ ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
সারা দেশে শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচন চলাকালে পৃথক ঘটনায় কিছু অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লা, মুন্সিগঞ্জ ও গোপালগঞ্জে ভোটকেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। কিছু জায়গায় পোলিং এজেন্টদের বাধা দেওয়া, জাল ভোট ও ব্যালটে সিল মারার অভিযোগও পাওয়া যায়। ভোটের আগের দিন কিছু আসনে কোনো কোনো দলের প্রার্থীদের পক্ষ থেকে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণের অভিযোগও ওঠে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সহিংসতা ও অনিয়মের অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই প্রতিটি অভিযোগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রাথমিকভাবে নির্বাচন নিয়ে বিএনপি, জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে গুরুতর কোনো অনিয়মের অভিযোগ আসেনি। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর গতকাল বিকেলে জাতিকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, প্রার্থীদের সংযম ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের পেশাদারত্ব—এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাই প্রমাণ করেছে যে গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অটুট।’ আমরাও মনে করি, গণতন্ত্রের প্রতি দেশের নাগরিকদের সমর্থন যে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে, এই নির্বাচন আবারও তারই প্রমাণ দিয়েছে।
নির্বাচনে একটি পক্ষ বিজয়ী এবং আরেক পক্ষ পরাজিত হবে, সেটাই স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রীতি। আমরা আশা করি, তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত দুই মাসে রাজনৈতিক দলগুলো দেশের জনগণ ও গণতন্ত্রের প্রতি যে অঙ্গীকার দেখিয়েছে, নির্বাচনে ফলাফলের পরও তারা সেটির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই শেষ কথা নয়; নির্বাচন-পরবর্তী শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করাও খুব বড় একটি চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে পরাজিত দল ও প্রার্থীর কর্মী-সমর্থক এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যাতে কোনোভাবেই আক্রান্ত না হন, সেদিকে অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সজাগ থাকতে হবে।
গতকালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণের যে যাত্রা শুরু হলো, তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে বলেই দেশবাসী প্রত্যাশা করেন। গণতন্ত্রের এই যাত্রা সুদৃঢ় হোক।