দেশের অন্যতম প্রধান মৎস্যভান্ডার হাকালুকি হাওর জীববৈচিত্র্যের এক অমূল্য আধার। প্রতিবছর শীতের সময় তো বটেই, সারা বছরই বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকে এই হাওর এলাকা। কিন্তু সেই হাওর থেকে সম্প্রতি পাখি শিকারের যে নিষ্ঠুরতা ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা চরম উদ্বেগের বিষয়।
প্রথম আলোর খবরে এসেছে, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার সিংহনাদ জগৎপুর এলাকায় শিকারিরা একটি ঘুঘু পাখির চোখের পাতা সেলাই করে দিয়েছে, তার ডানা ও লেজ ছেঁটে ফেলা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এই পাখিকে ব্যবহার করা হচ্ছিল অন্য পাখি ধরার টোপ হিসেবে। এমন নির্মম আচরণ কেবল একটি বন্য প্রাণীর প্রতি সহিংসতা নয়, এটি আমাদের নৈতিক অবক্ষয়েরই প্রতিফলন।
বাংলাদেশে ২০১২ সালের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে বন্য পাখি ধরা, শিকার করা বা বন্দী করে রাখা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। তবু হাকালুকির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় দিনের আলোয় প্রকাশ্যে পাখি শিকার চলতে থাকা আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে। এটি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরদারি ও তৎপরতার সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে।
বাস্তবতা হলো, দেশের বিভিন্ন জলাভূমি ও বনাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অসাধু চক্র পাখি শিকারের সঙ্গে জড়িত। জাল, ফাঁদ কিংবা বিষটোপ ব্যবহার করে পাখি শিকার করা হচ্ছে নিয়মিতভাবে। এসব পাখি স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে, এমনকি বিলাসী খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয় কিছু মানুষের নীরব সমর্থন কিংবা উদাসীনতা এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ শিকারিদের আরও উৎসাহিত করছে।
পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, কৃষিজমির সুরক্ষা এবং খাদ্যশৃঙ্খল বজায় রাখতে পাখির অবদান অপরিসীম। তাই নির্বিচার পাখি শিকার চলতে থাকলে এর প্রভাব পড়বে পুরো পরিবেশব্যবস্থার ওপর।
এ পরিস্থিতিতে শুধু সচেতনতা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। হাকালুকি হাওরের মতো বিস্তীর্ণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি জোরদার করতে হবে। বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে একটি টেকসই সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আহত যে ঘুঘু পাখিকে উদ্ধার করা হয়েছে, সেটি যেন সঠিক পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে ওঠে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। তবে এই একটি ঘটনার মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; যারা এমন নিষ্ঠুরতায় জড়িত, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে হাকালুকি হাওরের আকাশ একদিন সত্যিই পাখিশূন্য হয়ে পড়বে।