অভিযুক্ত ওসি দায়িত্বে থাকেন কিসের জোরে

সম্পাদকীয়

কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দেশব্যাপী বিস্তৃত মাদকের মরণজাল ছিন্ন করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, খোদ সেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্যের বিরুদ্ধে যখন মাদক পাচার, জব্দ করা মাদক আত্মসাৎ ও অপরাধীকে সটকে পড়তে সাহায্য করার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলে, তখন তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, খুবই হতাশাজনকও। চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানার শাহ আমানত সেতু এলাকায় গত বছরের ডিসেম্বরে সংঘটিত এক লাখ ইয়াবা বড়ি গায়েব ও পাচারকারীকে ছেড়ে দেওয়ার যে ঘটনা সামনে এল, তাতে আমাদের পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনেই স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে, কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান (কনস্টেবল) যখন এক লাখ ইয়াবা পাচার করছিলেন, তখন বাকলিয়া থানার তল্লাশিচৌকিতে তিনি হাতেনাতে ধরা পড়েন। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের তোয়াক্কা না করে, ঘটনার সময় দায়িত্বরত উপপরিদর্শক ও সহকারী উপপরিদর্শকেরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে সেই বিশাল ইয়াবার চালান আত্মসাৎ করেন এবং পাচারকারী পুলিশ সদস্যকে ছেড়ে দেন। এ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার পেছনে বাকলিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিনের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে আটজন পুলিশ সদস্য ও পরে থানার পরিদর্শককে (তদন্ত) সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও মূল অভিযুক্ত ওসি আফতাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ছয় মাসেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তিনি মহানগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোতোয়ালি থানার ওসির মতো স্পর্শকাতর দায়িত্বে বহাল আছেন, যা বিস্ময়কর।

প্রশ্ন জাগে, এত বড় একটি মাদক–কাণ্ডের পর যেখানে বিভাগীয় মামলার পাশাপাশি অবিলম্বে ফৌজদারি মামলা দায়েরের জোর সুপারিশ ছিল, সেখানে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো নিয়মিত মামলা হলো না কেন? ছোট পদের পুলিশ সদস্যদের ওপর সব দায় চাপিয়ে প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আড়াল করার পেছনেই–বা কারা জড়িত ছিলেন? আত্মসাৎ করা ১ লাখ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার এবং মূল মাদক সরবরাহকারীকে গ্রেপ্তারে পুলিশের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তার পেছনেই–বা কী কাজ করেছে?

একজন ওসি যদি নিজেই এমন ঘৃণ্য মাদক সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষক বা মাদক পাচারকারীকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশদাতা হন, তবে তাঁর আওতাধীন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ যে কতটা প্রহসনে পরিণত হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

দুর্ভাগ্যবশত, চট্টগ্রামে পুলিশের একাংশের মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এ ঘটনার কিছুদিন পর বাকলিয়া এলাকাতেই খুলনা জেলা পুলিশের এক কনস্টেবল ৫০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। টেকনাফ-কক্সবাজার রুট দিয়ে মাদক পাচারের ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের ‘নিরাপদ বাহক’ হিসেবে ব্যবহার করা এবং উদ্ধার করা মাদক আবার পুলিশের মাধ্যমেই কালোবাজারে চলে যাওয়ার এই কৌশল এখন যেন একটি কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

একটি বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধ বা অপকর্মে জড়িয়ে যেতে পারেন। কিন্তু বাহিনীর ভাবমূর্তি ও কার্যকারিতার স্বার্থে যেটা জরুরি, তা হলো এ ধরনের সদস্যদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু বাকলিয়ার এ ঘটনাটিতে উল্টো চিত্রই দেখা গেল।

বর্তমান চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কমিশনার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার কথা বলেছেন এবং ঘটনাটি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা এই আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাই। শুধু অভিযুক্ত ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, তদন্তে নাম আসার পরও কাদের পৃষ্ঠপোষকতায় অভিযুক্ত ওসি তাঁর পদে বহাল থেকে গেলেন, কেন তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হলো না, আত্মসাৎ করা ইয়াবা কেন উদ্ধার করা গেল না—এর তদন্ত প্রয়োজন। বোঝা যায়, পুলিশে এই চক্রটি বেশ বড় শক্তিশালী। এখানে শুধু ‘খতিয়ে দেখার’ সুযোগ নেই। বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তরা চিহ্নিত এবং বিচারের মুখোমুখি হবেন, সেটাই প্রত্যাশিত। পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তির স্বার্থেই এটা জরুরি।