সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক পথই সমাধান

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনা শুধু ইরান নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি সংকটজনক মুহূর্ত তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে চালানো আকস্মিক এই হামলা ও হত্যাকাণ্ডের আমরা নিন্দা জানাই। এই হত্যাকাণ্ড আগ্রাসনের চূড়ান্ত প্রতীক হয়ে থাকবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরায়েল আরেকবার প্রমাণ করল, চূড়ান্ত ক্ষমতার কাছে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল্য কতটা ঠুনকো। এমন হঠকারী হামলা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও চরমপন্থার কত বড় ঝুঁকি তৈরি করে, তার বহু নজির ইতিহাসে রয়েছে।

গত বছরের জুনে ইরান–ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলমান ছিল। এর মধ্যেই শনিবার রাজধানী তেহরানসহ ইরানের বেশ কয়েকটি জায়গায় বিস্তৃত পরিসরে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই হামলায় তেহরানে নিজ কার্যালয়ে নিহত হন ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর মৃত্যুতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে দেশটি। 

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সামরিক বাহিনীর প্রধানসহ সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে বহু হতাহতের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরে মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৫০ শিশু নিহত হয়েছে। শিশু, নারীসহ বেসামরিক জনগণের ওপর নির্বিচার হামলা ও হত্যাকাণ্ড চূড়ান্তভাবে অগ্রহণযোগ্য ও নিন্দনীয়। উল্লেখ্য যে গাজায় নিরীহ জনগণের ওপর নিষ্ঠুর গণহত্যা চালানোর পরও ইসরায়েলকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে নিদারুণ ব্যর্থ হতে দেখেছি বিশ্বকে।  

ইরান পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলার অংশ হিসেবে ইসরায়েল এবং কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এসব হামলায় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের পক্ষ থেকেই আরও কঠোর হামলার হুঁশিয়ারি এসেছে।

এটা সত্য যে ইরানের শাসকদের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণকে দমন–পীড়নের অজস্র অভিযোগ রয়েছে। জানুয়ারি মাসে দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নিষ্ঠুর বলপ্রয়োগে দমন করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও বাইরে থেকে আগ্রাসন চালিয়ে ইরানে শাসনব্যবস্থা পাল্টানোর কোনো চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই চেষ্টা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি চূড়ান্ত অসম্মান। ইরানের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা ইরানি জনগণের হাতেই থাকতে হবে। এর আগে, জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। কাতার ও সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজনা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্স জরুরি ভিত্তিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বান করেছে। বর্তমান বিশ্বে যেকোনো যুদ্ধ ও সংঘাত কেবল নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে যে আটকে থাকে না, তার বড় দৃষ্টান্ত রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাণিজ্যে তার বড় ধরনের প্রভাব পড়বে এবং জ্বালানির সংকট তৈরি হবে। নতুন করে দুর্ভোগে পড়বে শতকোটি মানুষ। আমরা মনে করি, বিপজ্জনক এই সংঘাত বন্ধে জাতিসংঘ, ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। সামরিক নয়, কূটনৈতিক পদক্ষেপই উত্তেজনা প্রশমন ও সংঘাতের বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র পথ। সব পক্ষ সংযত ও দায়িত্বশীল হলেই কেবল বিশ্ব ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।

ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যের সব ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় ঢাকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলোতে আটকা পড়েছেন কয়েক হাজার বাংলাদেশি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং দূতাবাসগুলোকে তীক্ষ্ণভাবে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা এবং প্রবাসীদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো প্রয়োজন।