বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে

সম্পাদকীয়

আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও ‘খেয়ালখুশি’র উন্নয়নে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হারাতে বসেছে। ৬৯৮ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) করেছিলেন প্রখ্যাত স্থপতি মাজহারুল ইসলাম।

সবুজ বৃক্ষরাজি ও জলাশয়ের মাঝে একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন এবং আবাসিক হল মিলিয়ে এটি একটি পরিকল্পিত ক্যাম্পাস। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টির অবকাঠামো উন্নয়নে ২০১৮ সালে নেওয়া ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প’-এ পরিকল্পনার বালাই তো নেই-ই, অনিয়মের নানা অভিযোগে তা প্রশ্নবিদ্ধ। নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় ব্যয় বৃদ্ধির শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২১টি অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে।

এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য হল, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, একাডেমিক ভবনের সম্প্রসারণ ও খেলার কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ রয়েছে। দুটি কারণে এ প্রকল্পকে খেয়ালখুশির উন্নয়ন বলা হচ্ছে। প্রথমত, এ উন্নয়নকাজে গণ খাতে ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) মানা হয়নি। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়টির মহাপরিকল্পনা না মেনে কর্তাব্যক্তিদের ইচ্ছেমতো ভবন তৈরি করা হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে প্রায় শুরু থেকেই। নির্মাণকাজে যাতে বাধা সৃষ্টি না করা হয়, সে জন্য ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ এসেছিল। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাংশ আন্দোলনও করেন। এ ঘটনার পর ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তৎকালীন উপাচার্যসহ অন্য যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরে থাক, অভিযোগের তদন্ত পর্যন্ত করা হয়নি।

বড় অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার ঘটনা ঘটেছে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, প্রকল্প অনুমোদনের আগে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের সুযোগ নেই। অথচ প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালককে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ডিপিপিতে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে নকশা প্রণয়ন ও তদারকির কাজ করার কথা বলা হলেও চারটি সংস্থাকে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। দরপত্র আহ্বান ও জমার ক্ষেত্রেও শর্ত ভঙ্গ করেন প্রকল্প পরিচালক।

২১টি অবকাঠামো নির্মাণের কাজ হাতে নেওয়া হলেও আগে থেকে সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। ফলে বারবার নকশার পরিবর্তন করতে হয়েছে। যত্রতত্র অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত শ গাছ কাটা হয়েছে। পুরো প্রকল্প শেষ করতে আরও দুই শতাধিক গাছ কাটতে হতে পারে।

এভাবে নির্বিচার গাছ কাটার ফলে প্রাণ-প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ ছাড়া প্রকল্পে এমন কতকগুলো অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, যেগুলো অপ্রয়োজনীয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের থাকার জন্য বেশ কয়েকটি আবাসিক বাসভবন, কমপ্লেক্স ও টাওয়ার নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১২০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য ৪৭৮টি বাসা রয়েছে; কিন্তু থাকার মতো আগ্রহী না পাওয়ায় ১৯০টি বাসা খালি পড়ে রয়েছে। আগেও দেখা গেছে, দুটি প্রশাসনিক ভবন থাকা সত্ত্বেও ১৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে তৃতীয় প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। প্রথম আলোয় এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটির নির্মাণকাজ স্থগিত করেছিল।

কোনো প্রকল্পে কত ধরনের অনিয়ম, পরিকল্পনাহীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা থাকতে পারে, তার একটা প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হতে পারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পটি। প্রশ্ন হচ্ছে, ‘অধিকতর উন্নয়ন’ প্রকল্পে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে?