সরকারকে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে

সম্পাদকীয়

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্রপথে মানব পাচারের জন্য নিয়মিত রুট হয়ে উঠেছে কক্সবাজার। নতুন–পুরোনো মিলিয়ে ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নেওয়ার পর মানব পাচারের ঘটনা ঘটছে। মৌসুমি বায়ু চলে যাওয়ার পর শীত শুরুর আগের সময়টাতে সমুদ্র শান্ত থাকে। পাচারকারী চক্রগুলো এ সময়টাতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে।

২ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায় শীত মৌসুমে মানব পাচার ঠেকাতে যে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, আমরা তার সঙ্গে সহমত পোষণ করি। সামাজিক সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ড সক্রিয় ভূমিকা পালন করলে কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মানব পাচার বন্ধ সম্ভব।

অনেক রোহিঙ্গা তাদের ক্যাম্পের আঁটসাঁট জীবন থেকে মুক্তির আশায় ও উন্নত জীবনের সন্ধানে ঝুঁকি নিয়েও সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাড়ি দিতে মরিয়া। রোহিঙ্গা নারী ও মেয়েশিশুরা সবচেয়ে বেশি পাচারের শিকার হচ্ছে। পাচারের নিয়মিত রুট হয়ে ওঠায় বাংলাদেশি তরুণদের একটি অংশকেও মানব পাচারকারীরা এই অনিরাপদ রুটে সমুদ্র পাড়ি দিতে প্রলুব্ধ করছেন।

মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে মৃত্যু, পাচারকারীদের হাতে নির্যাতন, ট্রলারে খাবার ও পানি ফুরিয়ে যাওয়ায় মৃত্যু—এ রকম উদ্বেগজনক সংবাদ বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হতে দেখেছি। ২০২৪ সালে বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় ৬৫৭ জনের বেশি রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। মানব পাচারের কারণে মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায় আমাদের শ্রমবাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে যেকোনো মূল্যে ঝুঁকিপূর্ণ এই মানব পাচার বন্ধ করার বিকল্প নেই।

জেলার টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার ২১টি পয়েন্ট দিয়ে সমুদ্রপথে মানব পাচারের ঘটনা ঘটছে। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার জানান, মানব পাচারের শিকারও বেশি হচ্ছে রোহিঙ্গা মেয়েশিশুরা। পুলিশসহ যৌথ বাহিনীর অভিযানে পাচারের শিকার লোকজন নিয়মিত উদ্ধার হচ্ছে। গ্রেপ্তার হচ্ছে পাচারকারীরাও। তাঁর ভাষ্য হচ্ছে, পাচারের সংখ্যা কমেছে। কিন্তু এই ভাষ্য কতটা গ্রহণযোগ্য?

সাগরে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত আছে প্রায় পাঁচ হাজার ট্রলার। এর মধ্যে কারা মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-উপাত্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নেই। যত শিগগির সম্ভব ট্রলারে জিপিআরএস সিস্টেম স্থাপন এবং মাঝিদের অনলাইন ডেটাবেজের আওতায় আনা জরুরি।

মানব পাচার বন্ধ না হওয়ার আরেকটি বড় কারণ পাচারের শিকার রোহিঙ্গা পরিবারগুলো মামলা করতে আগ্রহী নয়। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর অভাব ও অপরাধীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন—এসব কারণেও বিচার আটকে আছে।

আমরা মনে করি, কক্সবাজার দিয়ে সমুদ্রপথে মানব পাচার বন্ধে সরকারকে শক্ত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা, স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য।