জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর কী করছে

সম্পাদকীয়

প্রতিবেশ-সংকটাপন্ন দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে আবারও রিসোর্ট নির্মাণের সংবাদ একই সঙ্গে হতাশা ও উদ্বেগের। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দ্বীপটিতে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রায় ১২টি রিসোর্ট নির্মাণের কাজ চলছে। প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপটিতে অবৈধ এই স্থাপনা নির্মাণের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। আর নির্মাণকাজে সহযোগিতা করছেন বিএনপির স্থানীয় নেতারা। সরকার একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা এবং পরিবেশ রক্ষায় নানা প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগ নিচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন নিছক মুনাফার স্বার্থে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেন্ট মার্টিনের সঙ্গে মূল ভূখণ্ড টেকনাফের যোগাযোগ প্রায়ই বিচ্ছিন্ন থাকছে। অথচ বেআইনি হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ইট, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রী পৌঁছাতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এ ছাড়া দ্বীপটির কেয়াবন ও নারকেলগাছ ধ্বংস করে এবং সৈকতের বালু ও চুনাপাথর ব্যবহার করে এসব রিসোর্ট নির্মাণের কাজ চলছে।

বাংলাদেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল সেন্ট মার্টিন দ্বীপটিতে প্রায় ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী ছিল। অপরিকল্পিত পর্যটন ও প্লাস্টিক দূষণের কারণে এর অনেক প্রজাতিই এখন হারিয়ে গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু ছোট্ট এই দ্বীপটিতে ৩০০-এর ওপরে অবৈধ হোটেল ও রিসোর্টই বলে দেয় যে মুনাফার কাছে পরিবেশ-প্রতিবেশের বিষয়টি বিগত সরকারগুলোর কাছে কতটা মূল্যহীন বলে বিবেচিত হয়েছে।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও অপার সৌন্দর্যই দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের মূল কারণ। সেখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণের কোনো সুযোগ আছে বলে আমরা মনে করি না। দুঃখজনক হলেও সত্যি, যে সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে, তাদের ছত্রচ্ছায়ায় রিসোর্ট, কটেজসহ অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ চলে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটন সীমিত ও প্লাস্টিক ব্যবহারে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। এরপর গত দুই বছরে দ্বীপটির প্রকৃতি ও পরিবেশে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তন প্রবাল দ্বীপটি বাঁচাতে বড় আশাবাদ জাগালেও রিসোর্ট নির্মাণের খবর সেটিকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

প্রশ্ন হচ্ছে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে নির্মাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়া কিংবা ১২টি রিসোর্ট নির্মাণকাজটি রাতারাতি কোনো আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের দৈত্য এসে করে দিয়ে যাচ্ছে? বাস্তবতা হচ্ছে প্রকাশ্যেই দ্বীপ ধ্বংসের এই কর্মযজ্ঞ চলছে। পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তাহলে কী করছে? অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যদি অবৈধ রিসোর্টসহ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ থাকতে পারে, তাহলে রাজনৈতিক সরকারের আমলে সেটা সম্ভব হচ্ছে না কেন? এর অর্থ হচ্ছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই কেবল এটা বন্ধ করা সম্ভব।

আমরা মনে করি, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যারা এসব অবৈধ রিসোর্ট নির্মাণের সঙ্গে জড়িত এবং যারা তাদের সহায়তা করছে, তাদের সবার বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশের ছাড়পত্র না নেওয়া হোটেল, রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঙ্গে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মিলিত ও কঠোর পদক্ষেপই প্রতিবেশ-সংকটাপন্ন সেন্ট মার্টিনকে বাঁচাতে পারে।