বাংলাদেশে মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হলেই যে বিষয়টি বারবার সামনে আসে, তা হলো অস্বাভাবিক হারে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার। চিকিৎসাগত প্রয়োজন থাকলে সিজারিয়ান অবশ্যই জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা। কিন্তু প্রয়োজন ছাড়াই অস্ত্রোপচার মা ও নবজাতকের জন্য অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি ও অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা তৈরি করে। এই বাস্তবতায় নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
গত ছয় মাসে এই কেন্দ্রে ১ হাজার ২৯৭ জন প্রসূতি ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ২৭৪ জনের স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে, অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে মাত্র ২৩ জনের। অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশ প্রসবই হয়েছে অস্ত্রোপচার ছাড়াই। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রমাণ করে দক্ষ ও আন্তরিক চিকিৎসাসেবা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে অধিকাংশ সন্তানের জন্ম স্বাভাবিকভাবেই সম্ভব।
এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি দেশের ৬৪টি জেলা পর্যায়ের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের সম্মান পেয়েছে নোয়াখালী কেন্দ্র। অথচ একসময় এই প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০১৬ সালে সেখানে প্রসবের সংখ্যা নেমে এসেছিল শূন্যে। ২০২১ সালে চিকিৎসক মুহাম্মদ জিহাদুল হকের নেতৃত্বে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। বছরের পর বছর স্বাভাবিক প্রসবের সংখ্যা বেড়েছে, মানুষের আস্থাও ফিরে এসেছে। এই দৃষ্টান্ত দেখিয়ে দেয় নেতৃত্ব, দায়বদ্ধতা ও সেবার মান—এই তিন বিষয় মিললে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানও উৎকর্ষের নজির গড়তে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সাফল্য এসেছে সীমাহীন সংকটের মধ্যেও। কেন্দ্রটিতে নিয়মিত জনবল নেই বললেই চলে। অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন। মেডিক্যাল অফিসারের পদ শূন্য, প্রসূতি–বিশেষজ্ঞ নেই, অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও জ্বালানির বাজেট নেই, প্রয়োজনীয় ওষুধেরও ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় স্বীকৃতি পেয়েছে, সেটিই প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত।
নোয়াখালীর অভিজ্ঞতা থেকে সরকারের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। দেশে যেখানে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান রোধে নানা নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে, সেখানে এই কেন্দ্রের কর্মপদ্ধতি বিশ্লেষণ করে অন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে জনবল নিয়োগ, ওষুধ সরবরাহ, অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার বাজেট এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত করা জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। অনেক পরিবার এখনো আর্থিক অসচ্ছলতা বা তথ্যের অভাবে ঘরে ঝুঁকিপূর্ণ প্রসব করায়, আবার কেউ কেউ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের শিকার হন। নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের সাফল্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে স্বাভাবিক প্রসবের প্রতি আস্থা আরও বাড়বে।