টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, সিলেট অঞ্চলসহ দেশের আরও কয়েকটি জেলায় যে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে শুধু প্রাণহানিই হয়নি; কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানি যতই নামছে, ক্ষতের চিহ্ন ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এবারের বন্যা আকস্মিক হলেও ক্ষয়ক্ষতির যে ব্যাপকতা, তাতে জরুরি ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের সহায়তা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ না নেওয়া হলে দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, টানা বৃষ্টিতে দেশের ৪৩টি জেলা বন্যাকবলিত হলেও বেশি ক্ষতি হয়েছে ১৬টি জেলার। এবারের বন্যায় মোট এক লাখ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে ছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান তলিয়ে আছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ২০ হাজার হেক্টরের বেশি সবজির জমি।
কৃষির পর বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মৎস্য খাতে। বন্যার পানিতে পুকুর, ঘের ও খামারের মাছ ভেসে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার মাছের খামার ও পুকুর এবং ৩ হাজার ৮৮৯টি মাছের ঘের। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় এলাকার অনেক পুকুর ও চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৪০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকার।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বন্যায় গবাদিপশুর খামার, হাঁস-মুরগির খামার, দানাদার পশুখাদ্য, খড় ও ঘাসের খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৮১ কোটি টাকা।
বৃষ্টি ও ডিজেল–সংকটে এবার এমনিতেই বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হয়নি। বন্যার কারণে ১০ শতাংশ আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদেরা। এ হিসাবে আউশের উৎপাদন তিন লাখ টন কম হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ধান ও চালের বাজার যাতে কোনোভাবেই অস্থিতিশীল না হয়ে ওঠে, সেদিকে সরকারকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে, আগেভাগেই উদ্যোগ নিতে হবে। আশু করণীয় হিসেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে অবশ্যই আমনের ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলা যাতে আবার তৈরি করা যায়, তার জন্য কৃষককে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে।
বন্যার প্রভাব এরই মধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে। বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজি, মাছ, মুরগি ও ডিমের দাম বেড়েছে। প্রায় চার বছর চলা টানা উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য ও সীমিত আয়ের মানুষেরা জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় ব্যয় কাটছাঁট করে জীবন চালাচ্ছেন। বন্যার কারণে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ সহ্য করা তাঁদের অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়।
এবারের বন্যায় বড় ক্ষয়ক্ষতি হলেও সেই তুলনায় সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ ও পুনর্বাসন তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। কৃষি, মৎস্য ও পশুসম্পদ খাতে যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় এবং উদ্যোগী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, খামারি ও মৎস্যচাষিদের তালিকা দ্রুত তৈরি করে তাঁদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। আউশচাষি ও সবজিচাষিদের বীজসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলে পশুখাদ্যের সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলো উদ্যোগী হলে বন্যার এই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা মোটেই কঠিন কোনো কাজ নয়।