কোনো পক্ষই যেন বঞ্চিত না হয়

সম্পাদকীয়

প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা সারা দেশে ধর্মঘট পালন করায় সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান ও পরীক্ষা বন্ধ আছে। তাঁরা এর নাম দিয়েছেন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। গত বুধবার প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা শাহবাগে সড়ক অবরোধ, একপর্যায়ে যমুনা অভিমুখে মিছিল নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁদের ওপর পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, জলকামান ব্যবহার ও লাঠিপেটায় অনেকে আহত হন। সেখানে পুলিশের মারমুখী আচরণ আন্দোলনকারীদের আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এ ঘটনার পরই সরকারের টনক নড়ে।

গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে তিন দফা দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হলেও সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ছিল দুর্ভাগ্যজনক। প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের সভাপতি মো. ওয়ালী উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তিনটি দাবির বিষয় জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং মন্ত্রণালয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে চিঠি দিয়েছিলাম; কিন্তু আশানুরূপ কোনো সাড়া বা উদ্যোগ দেখিনি। সে জন্য বুধবার থেকে আমরা কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হই।’

প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হলো: নবম গ্রেডে সহকারী প্রকৌশলী পদে কেবল পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ ও ন্যূনতম যোগ্যতা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার করা; দশম গ্রেডে শুধু ডিপ্লোমাধারী ব্যক্তিরা আবেদন করতে পারেন, সেখানে উচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যক্তিদেরও আবেদনের সুযোগ রাখা ও বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং যাঁরা সম্পন্ন করবেন, তাঁরাই যেন প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার) লিখতে পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া। প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষকেরাও সমর্থন জানিয়েছেন। ঢাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিপেটার প্রতিবাদ করেছেন সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁরা বলেছেন, দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

অন্যদিকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা সাত দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন। তাঁদের সাত দফার মধ্যে রয়েছে: ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য সংরক্ষিত উপসহকারী প্রকৌশলী বা সমমান পদ সংরক্ষণ, উপসহকারী প্রকৌশলী বা সমমান পদ থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, জাতীয় মেধার অপচয় রোধে প্রকৌশলীদের পেশা পরিবর্তন বন্ধ, আন্তর্জাতিক ইঞ্জিনিয়ারিং টিম কনসেপ্ট অনুযায়ী ১:৫ অনুপাতে সব প্রকৌশল সংস্থার জনবলকাঠামো গঠন।

তিন দফা দাবিতে যেদিন প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা শাহবাগ অবরোধ করেন, সেদিনই কাকরাইলে আইডিইবি ভবনের সামনে বিক্ষোভ করে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র-শিক্ষক পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ।

বুধবারের ঘটনার পর সরকার উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের নেতৃত্বে আট সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। সেই কমিটি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসলেও জট খোলেনি। এরপর সরকার একজন সচিবের নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়। দুই কমিটিই একযোগে কাজ করবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করার দায়িত্ব ওয়ার্কিং কমিটির।

প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানাতে চাই যে বিলম্বে হলেও আন্দোলন কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ এড়ানোর কথা বলেছেন। নিত্যযানজটের এই ঢাকা শহরে সড়ক বন্ধ করে কর্মসূচি পালন করলে নগরবাসী সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হন। বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও অজানা নয়। তারপরও আন্দোলন মাঠে না গড়ানো এবং অঘটন না ঘটা পর্যন্ত সজাগ হন না। সড়ক বন্ধ করে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আন্দোলনে ইতিমধ্যে অনেক ক্ষতি হয়েছে। এটি আর বাড়তে দেওয়া যায় না। আশা করি, সরকারের দুই কমিটি অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে অবিলম্বে একটি সমাধানসূত্র বের করতে পারবে।

এ ক্ষেত্রে প্রকৌশল ও ডিপ্লোমা প্রকৌশল শিক্ষার্থী উভয় পক্ষের কাছে সংবেদনশীল আচরণ প্রত্যাশিত হবে। এক পক্ষের দাবি মানতে গিয়ে যাতে অন্য পক্ষ কোনোভাবে বঞ্চিত না হয়। প্রয়োজনে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও উদাহরণ কাজে লাগানো যেতে পারে। কিন্তু আন্দোলনের নামে জনগণকে জিম্মি করা যাবে না।