বাজেটে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় জনপ্রশাসন খাতে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ উন্নয়ন বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ বাড়ানো যায় না। এ বাস্তবতায় ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং এর অধীন দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, করপোরেশন মিলিয়ে ৩৫০টির বেশি সংস্থার যৌক্তিকতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। অতীতে জনপ্রশাসন সংস্কারে যে কমিটি ও কমিশন গঠন করা হয়েছে, তারা তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থা কমিয়ে আনার সুপারিশ করেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, কোনো সরকারই সেটা বাস্তবায়ন করেনি। বিগত সময়ে সরকারি সংস্থাগুলোয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারঘনিষ্ঠ আমলাদের পুনর্বাসনকেন্দ্র করে তোলা হয়েছিল। ফলে সরকারি দু-একটি বাদ দিয়ে এসব সংস্থা স্বজনপ্রীতি, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
এ পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর সরকারি সংস্থাগুলোর প্রধান পদে এবং জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে দলীয় নেতাদের বসানোর ঘটনা উদ্বেগজনক। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ১১টি সরকারি ও ৭টি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে নিয়োগ পাওয়া নেতাদের কেউই নিয়োগের শর্ত মেনে দল ও সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেননি। দল থেকেও তাঁদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। সরকারি সংস্থাগুলোর প্রধানের পদ জনপ্রতিনিধির পদ না হওয়ায় দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে এখানে দায়িত্ব পালন করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি সংস্থা কি রাজনৈতিক দলের নেতাদের পুনর্বাসনকেন্দ্র হতে পারে?
আগের সরকারগুলো সরকারি সংস্থাগুলোয় মূলত সরকারঘনিষ্ঠ আমলাদের নিয়োগ দিত, বিএনপি সেখানে নিজ দলের নেতাদের নিয়োগ দিচ্ছে। এ নিয়োগ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে বিএনপি কি তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পয়েল সিস্টেম’ অনুসরণ করে সরকারি সংস্থায় দলীয় লোক বসাচ্ছে? কিন্তু এ ব্যবস্থায় দুর্নীতি, অদক্ষতা ও স্বজনপ্রীতি বেড়ে যাওয়ায় ১৮৮৩ সালে দেশটি পেন্ডলটন অ্যাক্টের মাধ্যমে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা চালু করে। ফলে আমরা মনে করি, দুর্নীতি, অদক্ষতা ও স্বজনপ্রীতিকে উৎসাহিত করে এমন কোনো ব্যবস্থা চালু করা হলে তার ফলাফল কোনোভাবেই ইতিবাচক হতে পারে না।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের মধ্যে পার্থক্যরেখাটা মুছে গিয়েছিল। এমন দলীয়করণের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে মেধা, সততা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরকারি সংস্থায় দলীয় নেতাদের নিয়োগ সরকারি দলের ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অভ্যুত্থান সংস্কারের জন্য যে বিশাল জনপ্রত্যাশা তৈরি করেছে, এমন সিদ্ধান্ত তার পরিপন্থীও।
আমলাদের মধ্যে সরকারি সংস্থার প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়ার মতো নিজেদের বিশ্বস্ত লোক পাওয়া যাচ্ছে না কিংবা বিগত সময়ে আমলাদের দিয়ে এসব সংস্থা পরিচালনা করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি—এমন যুক্তিতে রাজনীতিবিদদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি কোনো বিবেচনাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার বা বিগত সময়ে দলের প্রতি কে কতটা ত্যাগ করেছেন, এটা সরকারি সংস্থার শীর্ষ পদে নিয়োগের কোনো মাপকাঠি হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে নিয়োগের একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত, নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পদে বসার জন্য দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা আছে কি না।
আমরা মনে করি, সরকারি সংস্থাগুলো কোনোভাবেই বঞ্চিত রাজনৈতিক নেতাদের ও সরকারঘনিষ্ঠ আমলাদের পুনর্বাসনকেন্দ্র হতে পারে না। বিএনপিকে অবশ্যই জনপ্রত্যাশা ও দলের ইশতেহারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।