সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। সর্বশেষ ২০১৪ সালে অষ্টম বেতন কমিশন প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল; ২০১৫ সালে সেটি বাস্তবায়ন শুরু হয়।
বেতন কমিশন যে সুপারিশ করেছে, তাতে বেতন-ভাতা বর্তমান বেতনকাঠামোর তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বাড়বে। সর্বনিম্ন স্তরে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ স্তরে মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে বাড়তি ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার সংস্থান করতে হবে।
কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের পদ্ধতি ঠিক করতে সরকার একটি কমিটি গঠন করবে। আমরা মনে করি, নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের যে বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন, তার সংস্থান করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ধার না করে এবং নাগরিকদের ঘাড়ে ভ্যাটসহ পরোক্ষ করের বোঝা না চাপিয়ে মোটা অঙ্কের এই অর্থায়ন কীভাবে আসবে, সেটি বের করাটাই সরকারের জরুরি কর্তব্য।
এটা সত্য যে সরকারি চাকরিজীবীদের নিচের গ্রেডগুলোর বেতন-ভাতা বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন স্তরের মধ্যে বৈষম্যের মাত্রাটাও অনেক বেশি। এ প্রেক্ষাপটে নবম কমিশন সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ স্তরে বেতনের অনুপাত ১: ৮ করার যে সুপারিশ করেছে, সেটি বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে সামান্য অগ্রগতি। তবে এক ধাপে দ্বিগুণের বেশি বেতন বাড়ানো কিংবা সব স্তরে একসঙ্গে বেতন বাড়ানো কতটা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। অষ্টম বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের পর থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা বছরে নিয়মিত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি ৫-১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছেন। এ ছাড়া ওপরের স্তরের কর্মকর্তারা সহজ শর্তে গাড়ি কেনার ঋণসহ বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করে আসছেন।
আমরা মনে করি, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন–ভাতা বৃদ্ধির আগে অর্থায়ন কীভাবে হবে, তা নিশ্চিত করা দরকার বলে যে প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারকে অবশ্যই তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বাস্তবতা হলো ভ্যাটসহ নানা পরোক্ষ কর বাড়িয়ে এবং বিদ্যুৎ–জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানোর পরও রাজস্ব আয় চার লাখ কোটি টাকার ওপরে ওঠানো যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা, দেশি-বিদেশি ঋণ পরিশোধসহ সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে, বিপরীতে উন্নয়ন ব্যয় কমেছে। ফলে সরকারের সামনে ভর্তুকি কমানো, সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় কমানো ছাড়া দৃশ্যমান বিকল্প নেই। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তাতে ভুক্তভোগী ও বঞ্চিত হবেন সাধারণ নাগরিক, কৃষক, নারী, বিধবাসহ প্রান্তিক ও নাজুক জনগোষ্ঠী। সরকারের সামনে আরেকটি সম্ভাব্য বিকল্প হলো ধার করে অর্থের সংস্থান করা; কিন্তু তাতে মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে চাপবে। এমনিতেই প্রায় তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ বহন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
বিনিয়োগে স্থবিরতা, গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য এবং ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের মূল চালিকা শক্তি বেসরকারি খাত এমনিতেই থমকে আছে। সরকারি খাতে বেতন-ভাতা বাড়ানোর সঙ্গে বেসরকারি খাতের ওপর যে চাপ পড়বে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেই চাপ কতটা নেওয়া সম্ভব, সেই প্রশ্নও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। সর্বোপরি রাজস্ব ও ঋণের কারণে অর্থনীতি যাতে ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকিতে না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।