অন্যান্য স্থানীয় সরকার সংস্থা থেকে জেলা পরিষদের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য হলো এটি পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলররা এর ভোটার। এটি অনেকটা পাকিস্তান আমলে সামরিক শাসক আইয়ুব খান প্রবর্তিত মৌলিক গণতন্ত্রের ধাঁচের। আমরা সব ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ কোটাব্যবস্থা চালু করেছি, কিন্তু জেলা পরিষদেই ব্যতিক্রম রেখে দিয়েছি অজ্ঞাত কারণে। জেলা পরিষদ আইন পাসের পর এটি দ্বিতীয় নির্বাচন এবং দুবারই প্রধান বিরোধী দল বর্জন করেছে।

বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার সংস্থা শুরু থেকে নির্দলীয় পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়ে আসছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলীয় মোড়ক পরানোয় এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে প্রায় একীভূত হয়ে পড়েছে।

অনেকে জেলা পরিষদকে ক্ষমতাসীন দলের পুনর্বাসন কেন্দ্র বলে অভিহিত করছেন, যাঁরা জাতীয় সংসদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদে স্থান পান না—তাঁদেরই জেলা পরিষদে পুনর্বাসিত করা হয়। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে, ৫৯টি জেলা পরিষদের মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জিতেছেন ৪৯টিতে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জিতেছেন ৬টিতে। আওয়ামী লীগের বাইরে জাতীয় পার্টির একজন এবং তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।

যেই নির্বাচনের ফল আগেই নির্ধারিত, সেই নির্বাচন করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনে কোন দলের কতজন জয়ী হয়েছেন, কতজন পরাজিত হয়েছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে কি না।

জেলা পরিষদ নির্বাচনে কোনো সংঘাতের ঘটনা না ঘটায় নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। কিন্তু জনগণ এ রকম একটি নির্বাচনে মোটেই আশ্বস্ত হবেন না। ভেঙে পড়া নির্বাচনী ব্যবস্থাও পুনরুদ্ধার হবে না।

জেলা পরিষদ নির্বাচনে কোনো সংঘাতের ঘটনা না ঘটলেও বরিশালের মেয়র যেভাবে একজন কর্তব্যরত ইউএনওকে হুমকি দিয়েছেন, তঁার প্রতি অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছেন, তাতে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কোনো সরকারি কর্মকর্তা এই দায়িত্ব পালন করতে চাইবেন না। নির্বাচন কমিশনের উচিত, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। সরকারি কর্মকর্তা কিংবা জনপ্রতিনিধি কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন।

স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার বা স্থানীয় শাসন নিয়েও ভাবনার সময় এসেছে। স্থানীয় সরকার বা শাসনকে শক্তিশালী করতে হলে তাদের ক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

কেন্দ্রীয় সরকারের খবরদারি কমাতে হবে। অনেক স্থানীয় সরকার সংস্থার আর্থিক সক্ষমতা থাকার পরও তাদের প্রায় প্রতিটি কাজে মন্ত্রণালয় তথা কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হয়। এটা বিকেন্দ্রীকরণ ধারণার পরিপন্থী।

স্থানীয় সরকার সংস্থাকে কার্যকর ও টেকসই করতে হলে নতুন করে চিন্তাভাবনার সময় এসেছে। যেভাবে চলছে, সেভাবে চলতে দেওয়া যায় না।