রোগী নয়, রোগ দূর করুন

সম্পাদকীয়

একটি রোগ শনাক্ত হওয়ার কারণে কাউকে জীবনের গতিপথ থেকে হঠাৎ ছিটকে ফেলাটা চূড়ান্ত অমানবিকতার নজির। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনে এই অমানবিকতাই যেন দিন দিন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এইচআইভি শনাক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশি শ্রমিকদের কোনো চিকিৎসাসেবা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এই চর্চা বহু বছর ধরেই চলছে। অথচ ব্যাপারটি নিয়ে জনসমাজে কিংবা প্রশাসনিক পরিসরে কোনো আলাপ দেখা যায় না।

বিদেশে কাজ করতে যাওয়া অধিকাংশ শ্রমিকের স্বপ্ন খুব সাধারণ। ঋণ শোধ করা, পরিবারের খরচ চালানো, একটু ভালো জীবন। তাঁরা তেমন বিলাসী স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ যান না। দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকা, একাকিত্ব, মানসিক চাপ আর সীমিত স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে তাঁরা কাজ করেন। এমন বাস্তবতায় কেউ অসুস্থ হলে, বিশেষ করে এইচআইভির মতো একটি রোগ শনাক্ত হলে তাঁকে কোনো চিকিৎসা পরিকল্পনা ছাড়াই নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া অমানবিক ছাড়া আর কিছু নয়।

এইচআইভি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, এই রোগ বাতাসে ছড়ায় না বা সাধারণ মেলামেশায় সংক্রমিত হয় না। চিকিৎসার আওতায় থাকলে একজন এইচআইভি আক্রান্ত মানুষ স্বাভাবিক জীবন ও কাজ করতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বহুবার বলেছে, শুধু এইচআইভির কারণে কাউকে বহিষ্কার করা বৈষম্যমূলক। তবু মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে এই পুরোনো ও বৈজ্ঞানিকভাবে অগ্রহণযোগ্য নীতি এখনো বহাল রয়েছে।

সমস্যা শুধু গন্তব্য দেশগুলোর নয়। দেশে ফিরে আসার পরও এই শ্রমিকেরা প্রায় একা হয়ে যান। বিনা মূল্যে ওষুধ দেওয়া হলেও কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা কিংবা জীবিকা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা খুবই সীমিত। হঠাৎ কাজ হারানো, আয় বন্ধ হওয়া আর সামাজিক কলঙ্কের ভয় একসঙ্গে চাপ তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকেও সত্য জানাতে তাঁরা ভয় পান।

এখানেই রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে। প্রবাস মানে কেবল রেমিট্যান্স নয়, প্রবাস মানে নাগরিকের জীবন, স্বাস্থ্য এবং মর্যাদাও। বিদেশে যখন নীরবে দেশের শ্রমিক বহিষ্কার করা হয়, দেশও তখন কেন নীরব থাকে? এই নীরবতা ভাঙা জরুরি।

বিদেশে যাওয়ার আগে এইচআইভি নেগেটিভ সনদ বাধ্যতামূলক হলেও ঝুঁকি কমানো, নিরাপদ আচরণ বা যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেই। আমরা আশা করি, বিদেশে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের জন্য সহজ ভাষায় বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যশিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এইচআইভিভিত্তিক বহিষ্কার বন্ধ করার বিষয়টি জোরালোভাবে তোলা হবে। দেশে ফিরে আসা আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা ও পুনর্বাসনের আলাদা কাঠামো গড়ে তোলা হোক।