সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি

সম্পাদকীয়

হাসিনা সরকার ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে বিরোধী রাজনীতি ও মত দমনে যে কয়টি উপায়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল, তার মধ্যে বলপূর্বক গুম ছিল অন্যতম। দেড় দশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বলপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের একের পর এক ঘটনা ঘটেছিল। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এ বিষয়টি আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো।

বাংলাদেশের নাগরিকেরা আর পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে ফিরে যেতে চান না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হোক, সেটিও তাঁরা চান না। ফলে বলপূর্বক গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার অবসান ঘটাতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে গুম কমিশন গুম-কাণ্ডে র‍্যাবের বিলুপ্তি ও গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কারসহ ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কারের যে সুপারিশ দিয়েছে, তা যথার্থ বলেই আমরা মনে করি।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত রোববার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সোমবার সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের নানা দিক ও সুপারিশ সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানান কমিশনের সভাপতি ও সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী।

চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, যাচাই-বাছাই শেষে মোট ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল। এর মধ্যে ২৫১ জন নিখোঁজ ও ৩৬ জনের গুম–পরবর্তী লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। কমিশন তার তদন্তে খুঁজে পেয়েছে, গুম করে হত্যার পর অনেক ব্যক্তির লাশ বরিশালের বলেশ্বর নদ ও বরগুনার পাথরঘাটায় ফেলা হয়েছে। মুন্সিগঞ্জে লাশ দাফনের কবরস্থানের সন্ধানও তারা পেয়েছে।

এর অর্থ পুলিশ–র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে শুধু নাগরিকদের জোরপূর্বক তুলে আনা, আয়নাঘরের মতো বেআইনি বন্দিশালাকে আটক ও নির্যাতনের কাজেই শুধু ব্যবহার করা হয়নি, হত্যা ও লাশ গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজেও ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় সব কটি বাহিনীর বিরুদ্ধেই কমবেশি গুমের অভিযোগ রয়েছে; কিন্তু সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ গুমের অভিযোগে জড়িত র‍্যাব। এরপর পুলিশ ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই, এনএসআইয়ের বিরুদ্ধেও ব্যাপক হারে গুমের অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত কমিশন সারা দেশে ৪০টি বেআইনি বন্দিশালার সন্ধান পেয়েছে, এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি র‍্যাবের। গুম কমিশন গঠনের পর সবচেয়ে বেশি আলামত ধ্বংসও করেছে র‍্যাব।

২০০৪ সালে বিএনপি–জোট সরকারের আমলে এলিট ফোর্স হিসেবে র‍্যাবের যাত্রা শুরু হয়; কিন্তু শুরু থেকেই বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যার ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। আওয়ামী লীগের আমলে বাহিনীটি গুমের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে র‌্যাব ও এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদনে র‍্যাব এবং এনটিএমসি বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়েছে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নানা সময়ে র‍্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে আসছে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যবহারের বিরোধিতা করে দেশি–বিদেশি মনবাধিকার সংস্থা ও নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোও নানা দাবি জানিয়েছে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের কাছে দেওয়া সুপারিশে বিএনপি র‍্যাব বিলুপ্তির কথা বলেছে।

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নিপীড়নসহ র‍্যাবের বিরুদ্ধে যেসব গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ উঠেছে, তাতে র‍্যাব বাহিনীটির বিলুপ্তিই যৌক্তিক। এ ছাড়া গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংস্কার, সন্ত্রাসবিরোধী আইন বাতিল, বাহিনীগুলোর সদস্যদের বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণসহ যেসব সুপারিশ দিয়েছে, নাগরিকদের মানবাধিকার সুরক্ষায় সেগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে অবশ্যই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।