তদন্ত সংস্থা কেন ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকায়

সম্পাদকীয়

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থ পাচার বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান একটি বিষফোড়া হয়ে উঠলেও এটি প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক অঙ্গীকার দেখা যায় না। ২০০২ সালে দেশে প্রথম মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন হলেও, এ আইনে করা মামলার সংখ্যা যেমন কম, আবার মামলার তদন্ত ও বিচারের অগ্রগতি নেই বললেই চলে।

সম্প্রতি প্রথম আলোয় মানি লন্ডারিং নিয়ে তিন পর্বের প্রতিবেদনে বিদেশে অর্থ পাচারসহ মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত অপরাধের তদন্ত ও বিচারের যে সার্বিক ভঙ্গুর চিত্র উঠে এসেছে, তা একই সঙ্গে হতাশাজনক ও অগ্রহণযোগ্য। আইন পাস হওয়ার পর থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মানি লন্ডারিং আইনে মোট ৭৫২টি মামলা হলেও, মাত্র ৫৬টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। সাজা হয়েছে ৪৪ ব্যক্তির।

মানি লন্ডারিং মামলা নিষ্পত্তিতে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এর তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বলতা। বিদ্যমান আইনে মানি লন্ডারিং মামলা ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথা থাকলেও, বছরের পর বছর চলে যাওয়ার পরও আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয় না। আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে সবচেয়ে বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হলেও এ ধরনের মামলার তদন্তের অগ্রগতি সবচেয়ে খারাপ। এ ক্ষেত্রে তদন্তে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র আদালতে হাজির করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তি না থাকায় এ সমস্যায় পড়তে হয়।

বিদ্যমান আইনে মুদ্রা পাচারসহ ২৭ ধরনের অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের আওতায় আসবে। এসব অপরাধের সরাসরি তদন্তের দায়িত্বে রয়েছে দুদক, সিআইডি, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) দেওয়া সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পেলেই তদন্ত সংস্থাগুলো মামলা করতে পারে।

এটা অনস্বীকার্য যে মানি লন্ডারিং আইনের আওতাধীন অপরাধের যে ব্যাপ্তি, তাতে অনেকগুলো সংস্থাকে তদন্তের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। কিন্তু তদন্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং আধুনিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা নজরদারির মতো সরঞ্জামাদি ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতির কারণে একেকটা মামলার তদন্ত শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।

মানি লন্ডারিং মামলার আসামিদের সবচেয়ে বড় অংশটি হলো ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। রাজনীতিবিদ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। এ থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে অনেক ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধে জড়িত থাকছেন। আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতির কারণেই মানি লন্ডারিং করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে দেশে মানি লন্ডারিং অপরাধ বেড়ে চলেছে।

মাদক পাচার, চোরাচালান, মানব পাচার ঠেকানো মানি লন্ডারিং মামলার অন্যতম উদ্দেশ্য হলেও এ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা সবচেয়ে কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হুন্ডিতে লেনদেন হওয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা সম্ভব হয় না। তদন্ত সংস্থায় প্রশিক্ষিত লোকবলেরও ঘাটতি রয়েছে।

দেশের অর্থনীতিকে সংকটের হাত থেকে মুক্ত করতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের বিকল্প নেই। তদন্ত সংস্থাগুলোকে ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ বানিয়ে রাখলে এ ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।

২০২১ সালে প্রণীত জাতীয় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কৌশলপত্রে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা, তদন্ত সংস্থার সমস্যদের দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ, নিরপেক্ষ প্রসিকিউশন সার্ভিস গড়ে তোলা, তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটরদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর মতো সুপারিশ করা হয়েছে।

আমরা মনে করি, সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হবে। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার ছাড়া মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে জোরালো ব্যবস্থা নেওয়া কতটা সম্ভব?